পূর্ববর্তী ওলামায়ে কিরামের মতামতের গুরুত্ব – শায়েখ আব্দুল্লাহ আল মুনীর

পূর্ববর্তী ওলামায়ে কিরামের মতামতের গুরুত্ব – কোরআন-হাদীস বোঝার ব্যাপারে পূর্ববর্তী ওলামায়ে কিরামের মতামতের গুরুত্ব – শায়েখ আব্দুল্লাহ আল মুনীর

অনেকে প্রশ্ন করেন, কোরআন হাদীস বোঝার ক্ষেত্রে আমাদের সর্বদা সালফে সালেহীন বা পূর্ববর্তী ওলামায়ে কিরামদের অনুসরণ করতে হবে কেনো? সংক্ষেপে আমরা বলতে পারি তিনটি কারণে আমাদের পূর্ববর্তী ওলামায়ে কিরামদের অনুসরণ করতে হবে।

(১) কোরআন-হাদীসের সঠিক মর্মার্থ বোঝার জন্য যেসব যোগ্যতা থাকা আমরা জরুরী বলে উল্লেখ করেছি সেগুলোর প্রত্যেকটির ‍ উপর পৃথকভাবে চিন্তা করলে দেখা যাবে সাহাবায়ে কিরাম ও পরবর্তী ওলামায়ে কিরামের মধ্যে ঐ সকল যোগ্যতা যতটা বিদ্যামান ছিল আমাদের মধ্যে তার বিন্দু মাত্র একত্রিত হওয়া প্রায় অসম্ভব। প্রথমত সমসাময়িক আরবী ভাষা বা উক্ত ভাষার লোকদের বাচনভঙ্গির ব্যাপারে সাহাবায়ে কিরাম ও তাদের কাছাকাছি সময়ের ওলামায়ে দ্বীনের যে দক্ষতা ছিল আমাদের পক্ষে তার ধারে কাছেও পৌছানো সম্ভব নয়। কোরআন নাযিলের প্রেক্ষাপট সম্পকৃত জ্ঞানের ক্ষেত্রে একই কথা প্রযোজ্য। কোরান হাদীস তাদের সামনে নাযিল হয়েছিল। কোন আয়াত কোন পেক্ষাপটে নাযিল হচ্ছে তা তারা স্বচক্ষে অবলোকন করতেন। কোরআন ও হাদীসের যতটুকু অংশ তারা নিজেদের বক্ষে ধারণ করেছিলেন তা আমাদের নিকট অকল্পনীয় ও অসম্ভব মনে হয়। সে সময় জ্ঞানের পরিবেশ ছিল। জ্ঞানী ব্যক্তিরা একে অপরের সাথে সাক্ষাৎ করে মত বিনিময় করতেন। একজন আলেম কোনো মূল্যবান কথা বলার সাথে সাথেই শত সহস্র ছাত্র সেটা লিখে নিতো। বর্তমানে একজন জ্ঞানী ব্যক্তি যদি সৌভাগ্রক্রমে পাওয়া যায় তবে তার সাথে আলোচনা করার মতো কোনো আলেম বা তার কথা গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করার মতো কোনো ছাত্র মেলে না। ইমাম নাব্বী বলেন,

কোনো বিষয়ে পারদর্শী একজন আলেমের সাথে কিছু সময় আলোচনা করা বহু সময় বরং বহু দিন কিতাব পড়া ও মুখস্ত করার তুলনায় বেশি উপকারী। (শারহে মুসলিম)

যদি স্বচ্ছ চিন্তা ভাবনার কথা ধরা হয় তাহলে দেখা যাবে আমরা এমন এক যুগে আছি যখন বিভিন্ন বাতিল চিন্তা-দর্শন আমাদের মন মগজ আবিষ্ট করে রেখেছে। বিভিন্ন মহল হতে বিভিন্ন আপত্তি অভিযোগের প্রবল চাপে আমাদের মস্তিষ্ক বিকৃত হওয়ার পথে। এই অবস্থায় যদি স্বাধীনভাবে কোরআন-হাদীসে চিন্তা-গবেষণা করার চেষ্টা করা হয় তবে দেখা যাবে বর্তমান সময়ের বাতিল আদর্শ ও মতবাদ গুলোর কোনো একটিতে প্রভাবিত হয়ে কোরআন ও হাদীসের ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে। এর পরিণাম হিসাবে জন্ম নেবে একের পর এক বিদয়াত ও গোমরাহী। অপর দিকে রসুলুল্লাহ সাঃ এর ওফাতের পর সাহাবায়ে কিরাম ও পরবর্তী কয়েকটি যুগ জ্ঞান ও ঈমানের দিক হতে সোনালী যুগ ছিল।

(২) স্বয়ং রসুলুল্লাহ সাঃ বলেন, আমার উম্মতের মধ্যে সর্বত্তোম হলো আমার সাহাবারা, তারপর যারা আসবে, তারপর যারা আসবে। (মুত্তাফাকুন আলাইহি)

তোমাদের উপর দিয়ে যে সময়ই অতিবাহিত হবে পরের সময়টি তার চেয়ে নিকৃষ্ট হবে। (মুত্তাফাকুন আলাইহ)

ইবনে মাসউদ রাঃ এই কথা বলার পর বলেন, আমার উদ্দেশ্য এটা নয় যে সম্পদ ও প্রাচুর্য কমে যাবে বরং তোমাদের উপর যে দিনই আসবে পরের দিনটি আগের দিনের চেয়ে জ্ঞানের দিক হতে কম হবে। (ফাতহুল বারী)

রসুলুল্লাহ সাঃ বলেন, তোমাদের মধ্যে যে আমার পরে বেঁচে থাকবে সে অনেক মতপার্থক্য দেখতে পাবে। অতএব তোমাদের দায়িত্ব হলো আমার সুন্নাত ও সত্যপথ প্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাত মেনে চলা। (আবু দাউদ, আলবানী সহীহ বলেছেন)

রসুলুল্লাহ সাঃ এর সাক্ষ্য অনুযায়ী আমরা মুর্খতার যুগে রয়েছি এবং আমাদের পূর্বে উত্তম যুগসমূহ অতিবাহিত হয়ে গেছে। অতএব আমাদের করণীয় হলো ঐ যুগের ওলামায়ে দ্বীন ও আইম্মায়ে মুজতাহিদীনের বিশেষ করে সাহাবায়ে কিরাম ও খুলাফায়ে রাশেদীনের মতামত ও কর্মপদ্ধতিকে কোরআন ও হাদীস সঠিকভাবে বোঝার একমাত্র মাধ্যম মনে করা।

(৩) পূর্বে আমরা দেখেছি যে, কোরআন ও হাদীস বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করা যায়। প্রকৃত অর্থ, রুপক অর্থ, আম-খাছ, ইত্যাদি বিভিন্ন নিয়মকানুনের মাধ্যমে কোনো আয়াত বা হাদীসকে ব্যাখ্যা করা হয়। যদি ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে কোনো সীমা নির্ধারণ না করা হয় তবে সকল বিদয়াতী ফিরকা কোরআন হাদীসকে সহজেই নিজেদের পক্ষে ব্যাবহার করবে। এভাবে ব্যাপক ফিতনা দেখা দেবে।

কোনো মুমিনকে হত্যা করলে চিরস্থায়ী জাহান্নামের কথা যে আয়াতে বলা হয়েছে সেখানে চিরস্থায়ী বলতে প্রকৃত অর্থে চিরস্থায়ী বোঝানো হয়নি বরং লম্বা সময় বোঝানো হয়েছে। এই কথার উপর নির্ভর করে যদি কেউ বলে, কোরআনে বলা হয়েছে জান্নাতে মুমিনরা চিরস্থায়ী ভাবে থাকবে। এখানেও চিরস্থায়ী অর্থ লম্বা সময় অশেষ সময় নয়। তবে এই ব্যক্তির উত্তরে কি বলা যেতে পারে? এর সঠিক উত্তর হলো, আমরা নিজেদের ইচ্ছা মতো কোরআনের ব্যাখ্যা করতে পারিনা। কোন আয়াতে প্রকৃত অর্থ বুঝতে হবে আর কোনটিতে রুপক অর্থ বুঝতে হবে তা সাহাবায়ে কিরাম ও তাদের নিকটবর্তী যুগের ওলামায়ে কিরামের মতামতের আলোকে নির্ণয় করতে হবে। সকল ওলামায়ে কিরামের মতামত হলো খুলুদ শব্দটি প্রথম আয়াতে রুপক অর্থে এসেছে আর দ্বিতীয় আয়াতে প্রকৃত অর্থে এসেছে। তাদের মতামতকে উপেক্ষা করে নিজের মন মতো ব্যাখ্যা দেওয়া গোমরাহী ও পথভ্রষ্টতা বলে গণ্য হবে।

এমন আরো প্রচুর আয়াত ও হাদীস রয়েছে যদি পূর্ববর্তী ওলামায়ে কিরামকে উপেক্ষা করে সেসবের ব্যাখ্যা দেওয়া হয় তবে এমন সব আজব ও উদ্ভট ফতওয়া বের হবে যা দেখে ইবলীসও লজ্জা পাবে। খারেজী, কাদরীয়া, মুতাজিলা ইত্যাদি মতবাদের সৃষ্টিই হয়েছিল সাহাবায়ে কিরামের মতামতকে উপেক্ষা করে নিজেরদের মতো করে কোরআন বুঝার চেষ্টা করার কারণে।

এই সকল উদ্ভট ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ হতে যদি আল্লাহর দ্বীনকে রক্ষা করতে হয় তবে সালফে সালেহীনদের অনুসরণ ছাড়া বিকল্প নেই। ইবনে আব্বাস রাঃ যখন খারেজীদের সাথে আলোচনা করার জন্য গেলেন তখন তারা বললো আপনি কার পক্ষ হতে আসছেন? তিনি বললেন,

আমি রসুলুল্লাহ সাঃ এর সাহাবীদের পক্ষ হতে তোমাদের সাথে আলোচনা করতে এসেছি যাদের উপর ওহী নাযীল হয়েছে এবং তারা তার ব্যাখ্যা সম্পর্কে অধিক অবগত। (তিবরানী, মুজামে কাবীর)

খলীফা উমর ইবনে আব্দুল আজীজের নিকট কাদরিয়ারা নিজেরদের মতের পক্ষে দলীল হিসাবে কিছু আয়াত লিখে পাঠালে তিনি বললেন,

যদি তোমরা বলো, এই সব আয়াত কেনো নাযিল হয়েছে? তবে আমি বলবো এগুলো তারা (সাহাবায়ে কিরাম) পাঠ করেছেন তারা এগুলোর সঠিক ব্যাখ্যা জানতেন যা তোমরা জানো না। এগুলো পাঠ করার পরও তারা তাকদীরে বিশ্বাস করতেন। (আবু-দাউদ, আলবানী সহীহ বলেছেন) দেখা যাচ্ছে খারেজী ও কাদরিয়াদের ব্যাখ্যাকে ভুল প্রমান করার জন্য সাহাবায়ে কিরামের ব্যাখ্যা ও মতামতকে দলীল হিসাবে পেশ করা হচ্ছে। এছাড়া কোনো উপায় নেয়। যদি প্রত্যেককে তার নিজ মত অনুসারে কোরআন-হাদীস ব্যাখ্যা করার সুযোগ দেওয়া হয় তবে পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি হবে। বিদয়াত ও গোমরাহীর ছয়লাভ বয়ে যাবে। আল্লাহর নিকটই আশ্রয় চাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published.