হাদীসে নিসফে শা’বানের ফজীলত – শায়েখ আব্দুল্লাহ আল মুনীর

হাদীসে নিসফে শা’বানের ফজীলত

শাবান মাসের ফজীলত সম্পর্কে বেশ কিছু হাদীস বর্ণিত আছে আমরা সনদের অবস্থা সহ সেগুলো ক্রমান্বয়ে উল্লেখ করবো ইনশাআল্লাহ

(১)……………….

আয়েশা রাঃ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন আমি একদা রাতে রসুলুল্লাহ সাঃ কে আমার বিছানায় পেলাম না। ফলে আমি তাকে খুজতে বের হলাম। পরে আমি তাকে বাকীতে (মদীনার কবরস্থান) পেলাম। তিনি বললেন <তুমি কি মনে করেছো আল্লাহ ও তার রসুল তোমার প্রতি অবিচার করবেন?> আমি বললাম আমি তো ধারণা করেছি আপনি কোনো এক স্ত্রীর কিনট আছেন। তিনি বললেন, নিশ্চয় আল্লাহ শাবান মাসের মাঝ রাতে প্রথম আসমানে নেমে আসেন এবং কালব গোত্রের ছাগলের সংখার চেয়েও বেশি লোককে ক্ষমা করেন। (তিরমিযী,ইবনে মাযা, মিশকাত)

শায়েখ আলবানী বলেছেন, এই হাদীসের সকল রাবীই বিশ্বস্ত কিন্তু হাজ্জাজ ইবনে আরতা একজন মুদাল্লিস আর সে এখানে আনআন পদ্ধতিতে হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিরমিযী বলেছেন আমি ইমাম বুখারীকে এই হাদীসটি দূর্বল বলতে শুনেছি। (সিলসিলাতুস সাহীহা-১১৪৪)

(২)…………….

আয়েশা রাঃ হতে বর্ণিত তিনি বলেন রসুলুল্লাহ সাঃ বলেন, তুমি কি জানো এই রাতটির কি মর্যাদা? অর্থাৎ শাবান মাসের মাঝ রাত। তিনি বললেন এতে কি আছে হে আল্লাহর রাসুল? রসুলুল্লাহ সাঃ বললেন, আদম সন্তানের মধ্যে এই বছর কে জন্মাবে কে মারা যাবে এসব বিষয় এই রাতে লিপিবদ্ধ করা হয়, মানুষের আমল এই রাতে উপরে তোলা হয় এবং তাদের রিযিক আকাশ হতে অবতীর্ণ হয়। (মিশকাত)

এই হাদীসটিকে শায়খ আলবানী দূর্বল বলেছেন

(৩)…………….

যখন শা’বান মাসের মাঝ রাত্রি আগমন করে তখন তোমরা উক্ত রাতে সলাত পড়ো আর দিনে সওম পালন করো কেননা আল্লাহ ঐ রাতে সূর্য ডোবার সাথে সাথে প্রথম আসমানে নেমে এসে বলেন কেউ কি ক্ষমা চাইবে আমি তাকে ক্ষমা করবো? কেউ কি রিযিক প্রার্থনা করবে আমি তাকে রিযিক দেবো? কেউ কি সমস্যায় আছে আমি তার সমস্যা মিটিয়ে দেবো? এভাবে ফজরের সময় সূর্য উঠার পূর্ব পর্যন্ত একের পর এক বলতে থাকেন। (ইবনে মাযা)

এই হাদীসটির সনদ ভীষণ দূর্বল। শায়খ আলবানী বলেছেন, এই হাদীসটির সনদ দূর্বল হওয়ার ব্যাপারে সকলে একমত। বরং আমার নিকট এটি জাল হাদীস। কেননা আবু সিবরা হদীস জাল করতো বলে অভিযোগ আছে যেমনটি আত-তাকরীব নামক কিতাবে উল্লেখ আছে। (সিলসিলাতু আদ-দাইফা-২১৩২)

(৪)…………..

নিশ্চয় আল্লাহ শা’বান মাসের মাঝ রাতে বান্দাদের দিকে দৃষ্টি দনে এবং সমস্ত সৃষ্টিকে ক্ষমা করেন শুধু মুশরিক ও অন্য মুসলিমের সাথে বিবাদে লিপ্ত ব্যক্তি ছাড়া। (ইবনে মাযা, মিশকাত)

হাদীসটির অন্য একটি রেওয়ায়েত হলো, এই হাদীসটির অর্থ পূর্বের হাদীসটির মতই শুধু শব্দগত কিছু পার্থক্য ছাড়া। (তিবরানী, ইবনে হিব্বান, আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব, সিলসিলাতুস-সহীহা-১১৪৪)

শায়খ আলবানী সিলসিলাতুস সাহীহাতে বলেন, এই হাদীসটি সহীহ। এটি বহু সংখক সাহাবী হতে বিভিন্ন সনদে বর্ণিত আছে যার একটি অন্যটিকে শক্ত করে। যেসব সাহাবা হতে হাদীসটি বর্ণিত আছে তারা হলেন, মুআজ ইবনে জাবাল, আবু ছা’লাবা, আব্দুল্লাহ ইবনে আমর, আবু মুসা আল আশআরী, আবু হুরাইরা, আবু বকর আস-সিদ্দীক, আওফ ইবনে মালিক এবং আয়েশা রাঃ (সিলসিলাতুস সহীহা-১১৪৪)

যারা বলেন কোনো সহীহ হাদীসে শবে বরাত বা নিসফে শা’বানের ফজীলতের কথা উল্লেখ নেই তাদের কথা সঠিক নয়। আল্লামা নাসিরুদ্দীন আলবানী শেষের হাদীসটির ৮ টি সনদের উপর বিস্তারিত আলোচনার পর বলেন,

মোট কথা সমস্ত সুত্র একত্রি করলে এই হাদীসটি সহীহ হওয়ার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ অবশিষ্ট থাকে না। এখানে যা কিছু শর্ত পাওয়া গেছে তার চেয়ে অনেক কম শর্তে হাদীস সহীহ হয় যতক্ষণ না তাতে ভীষণ দুর্বলতা থাকে যেমনটি এই হাদীসে নেই। শায়খ কাসেমী রহেমাহুল্লাহ “ইসলাহুল মাসাজিদ” নামক কিতাবে জারহ্ ও তা’দীল শাস্ত্রের ইমামদের থেকে বর্ণনা করেছেন যে, শা’বান মাসের মাঝ রাতের ফজীলত সম্পর্কে কোনো সহীহ হাদীস নেই তার এ মতের উপর নির্ভর করা যাবে না। যদি কেউ সাধারনভাবে একথা বলে থাকে তবে তা এই হাদীসের সমস্ত সনদকে একত্রিত করার মতো কষ্ট শিকার না করে তাড়াহুড়া করে রায় দেওয়ার কারণে বলেছে। যেভাবে তুমি এখানে একত্রিত দেখতে পাচ্ছ আর আল্লাহই তাওফীক দাতা। (সিলসিলাতু আস সহীহা-১১৪৪)

ইবনে তাইমিয়া বলেন,

এই অধ্যায়ের আর একটি বিষয় হলো শাবান মাসের মাঝ রাত। এ রাতের ফজীলতে বেশ কিছু মারফু হাদীস এবং আছার বর্ণিত আছে যা প্রমাণ করে যে এ রাতটি ফজীলতপূর্ণ। পূর্ববর্তীদের কেউ কেউ এ রাতে বিশেষভাবে সলাত আদায় করতেন। শাবান মাসে (সাধারনভাবে শাবান মাসে বিশেষভাবে শাবান মাসের মাঝ রাতের উদ্দেশ্য নয়) সওম পালন করা সম্পর্কেও বেশ কিছু সহীহ হাদীস বর্ণিত আছে। মদীনাবাসী কোনো কোনো পূর্ববর্তী আলেম এবং অন্যান্য এলাকার পরবর্তী কিছু আলেম এর রাতের ফজীলত অস্বীকার করেছেন। তারা এ সম্পর্কে বর্ণিত হাদীসগুলোকে ত্রুটিপূর্ণ বলেছেন যেমন যে হাদীসে বলা হয়েছে আল্লাহ কালব গোত্রের ছাগলের পশম পরিমান মানুষকে ক্ষমা করেন (এই হাদীসটি ঐ হাদীসটি নয় যেটিকে আলবানী সহীহ বলেছেন)। তারা বলেন এই রাতের সাথে অন্য রাতগুলোর কোনো পার্থক্য নেই। কিন্তু যে মতের উপর আমাদের মাযহাবের বা অন্যান্য মাযহাবের বহু সংখক বরং বেশিরভাগ আলেম রয়েছেন তা হলো এই রাতটি অন্যান্য রাতের উপর ফজীলত রাখে। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বাল এর স্পষ্ট কথার মাধ্যমে এটিই জানা যায়। আর যেহেতু এবিষয়ে একাধিক হাদীস বর্ণিত হয়েছে এবং পূর্ববর্তীদের আমল সেসকল হাদীসকে সত্যায়ন করে। এই রাতের কিছু ফজীলত সুনান ও মুসনাদ গ্রন্থ সমূহতে উল্লেখিত রয়েছে তবে এ রাত সম্পর্কে কিছু জাল হাদীসও রয়েছে। (ইক্তিদাউস-সিরাত আল মুস্তাকীম)

তিরমিযী শরীফের ব্যাখ্যাগ্রন্থ তুহফাতুল আহওয়াজীতে বলেন, জেনে নাও শাবান মাসের মাঝ রাত সম্পর্কে প্রচুর হাদীস এসেছে যা একত্রে প্রমাণ করে যে বিষয়টির শরয়ী ভিত্তি রয়েছে।

পরে তিনি একের পর এক বিভিন্ন রেওয়ায়েতে উল্লেখ করে শেষে বলেন, অতএব এই সমস্ত হাদীস একত্রে তার বিরুদ্ধে দলীল যে দাবী করে শাবান মাসের মাঝ রাতের ফজীলত সম্পর্কে কোনো হাদীস প্রমাণিত হয়নি আর আল্লাহই ভাল জানেন। (তুহফাতুল আওয়াযী)

বিঃদ্রঃ অনেকে বলেছেন আল্লাহ প্রতি রাতের শেষভাগে প্রথম আসমানে অবতরন করেন বলে বর্ণিত আছে সুতরাং শবেবরাতের রাতের সাথে অন্যান্য রাতের পার্থক্য কোথায়? উত্তর হলো-

(ক) প্রতিরাতে অবতীর্ণ হওয়ার কথা যেখানে বলা হয়েছে সেখানে যখন রাতের শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকে তখন অবতীর্ণ হওয়ার কথা বলা হয়েছে আর বিশেষ করে শাবান মাসের মাঝ রাতের ক্ষেত্রে সাধারনভাবে শাবান মাসের মাঝ রাত এভাবে বলা হয়েছে। যা প্রমান করে সম্পূর্ণ রাতটিই ফজিলতপূর্ণ। মোল্লাহ আলী কারী বলেন,

হাদীসের প্রকাশ্য অর্থনুযায়ী বোঝা যায় এই রাতে আল্লাহর অবতরন তথা তার প্রকাশ, অসীম রহমত অবতরন, সাধারনভাবে সকল সৃষ্টি এবং বিশেষভাবে বাকী কবরস্থানে দাফনকৃত মৃতদের উপর ক্ষমা প্রদর্শন ইত্যাদি এ রাতের সম্পূর্ণ অংশ জুড়ে সম্পাদিত হয় এভাবে এই রাতটি অন্য সকল রাতের উপর শ্রেষ্ঠত্ব পায় যেহেতু অন্য সকল রাতে যে অবতরনের কথা বর্ণিত আছে তা রাতের শেষভাগের সাথে সংশ্লিষ্ট (সমস্ত রাত নয়)। (মিরকাতুল মাসাবিহ)

(খ) যদি অন্যান্য রাতের উপর এ রাতের কোনো শ্রেষ্টত্ব নাই থাকবে তবে বিশেষভাবে এই রাতের কথা উল্লেখ করারই বা কি প্রয়োজন? শুধু এই রাতকে বিশেষভাবে উল্লেখ করার মাধ্যমেই অন্যান্য রাতের উপর এর বিশেষত্ব প্রমানিত হয়।

নিসফে শা’বানের ফজীলত নিসফে শা’বানের ফজীলত

Leave a Reply

Your email address will not be published.