শবে বরাতের রাতের আমল – শায়েখ আব্দুল্লাহ আল মুনীর

শবে বরাতের রাতের আমল – শায়েখ আব্দুল্লাহ আল মুনীর এর মাজহাব বনাম আহলে হাদীস গ্রন্থ হতে হুবহু সংকলন করা হয়েছে এছাড়াও শায়েখের অডিও লেকচার পাবেন আমাদের বাংলা ইসলামীক সাইটে।

যারা এ রাত্রের ফজীলত সম্পর্কে কোনো সহীহ হাদীস আছে বলে মনে করেন না তারা এ রাত এবং এর পরবর্তী দিবস উপলক্ষে যে কোনো আমল করা অবৈধ ও বিদআত মনে করেন। কিন্তু আমরা পূর্বে দেখেছি যে, এ রাত্রের ফজীলত সম্পর্কে বহু সংক্ষক হাদীস বর্ণিত হয়েছে যার কিছু সহীহ, কিছু দূর্বল আর কিছু পুরোপুরি অগ্রহনযোগ্য। মোটের উপর এতটুকু স্পষ্টই প্রমাণিত যে, এ রাত্রে আল্লাহ তায়ালা তার বিপুল সংক্ষ্যক বান্দাকে ক্ষমা করেন। যে রাত্রে আল্লাহ তায়ালা বিশেষভাবে ক্ষমার ওয়াদা করেছেন সেই রাতে কাকুতি মিনতি করে তার নিকট ক্ষমা চাইতে হবে এটাই স্বাভাবিক। আর আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাওয়া, তওবা করা বা যে কোনো প্রকার দোয়া করার মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো কোনো ভাল আমলের মাধ্যমে দোয়াটিকে শক্ত করা যাতে দ্রুত কবুল হয়। বুখারী শরীফের তিন জন যুবকের কাহিনী হতে বিষয়টি স্পষ্ট হয় যারা পাহাড়ের গুহাতে আটকা পড়ে গিয়েছিল। পরে একজনের পরামর্শে প্রত্যেকের ভাল আমল উল্লেখ করে দোয়া করলে আল্লাহ তাদের মুক্ত করেন। (সহীহ বুখারী)

সুতরাং এই রাত্রে আল্লাহর পক্ষ হতে বিশেষভাবে ক্ষমা প্রদর্শনের বিষয়টি প্রমানিত হওয়ার মাধ্যমে সলাত, যিকির, কোরআন তেলাওয়াত করা প্রমাণিত হয়। পরবর্তী দিন সওম পালন করা প্রমাণিত হওয়ার ব্যাপারটি নিশ্চিত নয় কারণ জুমআর দিন একটি নির্দিষ্ট সময়ের ফজীলত বর্ণিত হয়েছে অথচ জুমআর দিন বিশেষভাবে সওম পালন করতে নিষেধ করা হয়েছে। তাছাড়া শবে বরাতের মাঝ রাতের পরের দিন সওম পালন করার ব্যাপারে একদিকে যেমন সহীহ হাদীস বর্ণিত হয়নি অন্যদিকে এবিষয়ে পূর্ববর্তীদের আমলও পাওয়া যায় না। এবিষয়ে আমরা পরে আলোচনা করেছি। লক্ষ্য করার বিষয় হচ্ছে শুধু মাত্র উক্ত সহীহ হাদীসের উপর ভিত্তি করলেই শাবান মাসের মাঝ রাতে সলাত আদায় করা, কোরআন তিলাওয়াত করা ইত্যাদি আমল গুলো বৈধ প্রমাণিত হয়।

এখানে অন্য একটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। যারা শবে বরাতের উদ্দেশ্যে যে কোনো আমল করা বিদআত মনে করেন তারা আরো একটি বিষয় ভুলে যান তা হলো ফজায়েলের ব্যাপারে দূর্বল হাদীসের উপরও আমল করা যায় এটা সমস্ত আলেমদের মত। ইমাম আন-নাব্বী বলেন,

ইমাম শাফেঈ তার কিতাব “আল-উম” এ বলেন, আমি জানতে পেরেছি পাঁচটি রজনীতে দোয়া কবুল করা হয় জুমআর রাত, ইদুল আদহার রাত, ইদুল ফিতরের রাত, রজব মাসের প্রথম রাত ও শাবান মাসের মাঝ রাত।

এরপর তিনি উক্ত রাত সমূহের পূর্ববর্তীদের কে কি আমল করতেন তা বর্ণনা করে পরে বলেন, ইমাম শাফেঈ বলেছেন, আমি এসব রাতে পূর্ববর্তীরা যা কিছু আমল করতো বলে বর্ণনা করেছি তা সবই মুস্তাহাব মনে করি ফরজ নয়। (ইমাম নাব্বী বলেন) ইমাম শাফেঈর কথা এই পর্যন্তই। তিনি এই রাত সমূহে আমল করা মুস্তাহাব মনে করেছেন যদিও এসব রাত সম্পর্কে বর্ণিত হাদীসসমূহ দূর্বল কারণ আমরা পূর্বেই বলেছি ফজীলত সংক্রান্ত ব্যাপারে দূর্বল হাদীস গ্রহনযোগ্য হয় এবং দূর্বলতা সত্বেও তার উপর আমল করা হয়। (আল মাজমু)

এ দুটি বিষয় অর্থাৎ শাবান মাসের মাঝ রাতে আল্লাহ বান্দাদের ক্ষমা করেন এ সংক্রান্ত সহীহ হাদীস থাকার কারণে এবং এ রাত্রের ফজীলতে অন্যান্য দূর্বল হাদীসগুলো ফাজায়েল সংক্রান্ত্র ব্যাপারে গ্রহনযোগ্য হওয়ার কারণে এ রাত্রে সলাত, যিকির, কোরআন তেলওয়াত বা অন্যান্য ইবাদত করতে কোনো সমস্যা নেই বরং তা উত্তম ও সওয়াবের কাজ। তবে পরদিন সওম পালন করার ব্যাপারে কোনো প্রমান পাওয়া যায় না। আবুল আলা মুহাম্মাদ আব্দুর রাহমান বলেন, শাবান মাসের মাঝ রাতের পরের দিন সওম পালন করার ব্যাপারে আমি কোনো সহীহ হাদীস পায়নি। ইবনে মাযা আলী রাঃ হতে যে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন যাতে বলা হয়েছে যখন শাবান মাসের মাঝরাত হয় তখন যে রাতে তোমরা সলাত আদায় করো আর তার পরদিন সওম পালন করো… আমি জানতে পেরেছি যে হাদীসটি ভীষণ দূর্বল। আলী রাঃ হতে আর একটি হাদীস বর্ণিত আছে যেখানে বলা হয়েছে, যদি কেউ ঐ দিন সওম পালন করা অবস্থায় সকাল করে তবে পিছনের ৬০ বছর এবং সামনে ৬০ বছর সওম পালন করার সমান সওয়াব হবে। ইবনে যাওজী হাদীসটিকে তার মাওজুআত নামক কিতাবে উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেন মাওজু। (তুহফাতুল আহওয়াজী শারহে তিরমিযী)

ইবনে তাইমিয়া বলেন, নির্দিষ্টভাবে শাবান মাসের মাঝ রাতের পরদিন সওম পালন করার কোনো ভিত্তি নেই বরং একাজ অপছন্দনীয়। একইভাবে এই দিবসকে উৎসবের দিন মনে করে খাবার তৈরী করা বা সাজ সজ্জা করা ভিত্তিহীন বিদয়াতী উৎসবের দিন মনে করে খাবার তৈরী করা বা সাজ সজ্জা করা ভিত্তিহীন বিদআতী উৎসব সমূহের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত। (ইক্তিদাউস সিরাতিল মুস্তাকীম)

তবে শাবান মাসের সওমের বিভিন্ন ফজীলত বর্ণিত হয়েছে। আয়েশা হতে বর্ণিত হাদীস, রসুলুল্লাহ সাঃ কোনো মাসেই শাবান অপেক্ষা বেশি সওম পালন করতেন না। তিনি শাবান মাসের সম্পূর্ণ মাসই সওম পালন করতেন। (সহীহ বুখারী)

মুসলিম শরীফের বর্ণনায় এসেছে, তিনি শাবান মাসে যে পরিমান সওম পালন করতেন অন্য কোনো মাসে তার চেয়ে বেশি সওম পালন করতে আমি তাকে দেখি নি। তিনি সম্পূর্ণ শাবান মাসেই সওম পালন করতেন অল্প কিছু ছাড়া। (সহীহ মুসলিম)

এই সমস্ত হাদীস প্রমাণ করে যে, সাধারণভাবে শাবান মাসে সওম পালন করার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে তবে নির্দিষ্ট করে শাবান মাসের মাঝ রাতের পরদিন সওম পালন করা সম্পর্কে গ্রহনযোগ্য কিছুই বর্ণিত না হওয়ার কারণে তা থেকে দূরে থাকতে হবে। কিন্তু কোনো ব্যক্তি যদি আয়্যামে বীজের তিনদিন রোজা রাখার নিয়তে শাবান মাসের ১৩, ১৪, এবং ১৫ তারিখ দিবসে রোজা রাখেন তবে তা উত্তম হবে। যেহেতু এ সম্পর্কিত সহীহ হাদীস রয়েছে,

আবু জার রাঃ বলেন রসুলুল্লাহ সাঃ আমাদের মাসের ১৩, ১৪, ১৫ এই তিন দিন সওম পালন করতে বলেছেন। (সুনানে নাসাঈ আলবানী হাসান বলেছেন)

শবে বরাতের রাতের আমল শবে বরাতের রাতের আমল

Leave a Reply

Your email address will not be published.