যুদ্ধে কৌশল হিসেবে কুফরীর বিধান – শায়েখ আব্দুল্লাহ আল মুনীর

যুদ্ধে কৌশল হিসেবে কুফরীর বিধান – শায়েখ আব্দুল্লাহ আল মুনীর এর তাওহীদ আর রহমান নামক তাওহীদ গ্রন্থ হতে হুবহু সংকলন করা হয়েছে

উপরে আমরা নিজের জীবন, সম্পদ ও সন্তান রক্ষার জন্য কুফরী কথা উচ্চারণ করা বৈধ হওয়া সম্পর্কে আলোচনা করেছি। আলেমদের মধ্যে কেউ কেউ এমনকি অন্য মুসলিমের উপর বিপদ আপতিত হওয়ার আশঙ্কাকেও ইকরাহ্ হিসেবে গণ্য করেছেন। ইবনে হিযাম রঃ বলেন, একইভাবে একজন মুসলিম বাধ্য হয়েছে বলে গণ্য হবে যদি কেউ অন্য কোনো মসলিমকে হত্যা করা, প্রহার করা, বন্দি করা বা তার সম্পদ বিনষ্ট করার হুমকী দেয়। যেহেতু রাসুলুল্লাহ সাঃ বলেছেন, একজন মুসলিম অন্য মুসলিমের ভাই তাকে সে জুলুম করে না, অসহায় অবস্থায় ছেড়েও দেয় না। (আল-মুহাল্লা)

মুসলিমদের রক্ত, সম্পদ ও সম্মান শত্রুদের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য কৌশল হিসেবে কুফরী করা এর মধ্যেই অন্তর্ভূক্ত। এ বিষয়ে কা’ব বিন আশরাফকে হত্যা করার ঘটনাটি উল্লেখ করা যায়। কা’ব বিন আশরাফ নামে এক ইয়াহুদী, রাসুলুল্লাহ সাঃ এর নিন্দা করে এবং মুসলিম নারীদের নামে অশ্লীল কবিতা লিখতো, এবং কাফিরদের মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার ব্যাপারে উসকানি দিতো। বুখারী ও মুসলিমে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাঃ মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামার উপর উক্ত ইয়াহুদীকে হত্যা করার দায়িত্ব অর্পণ করলে তিনি বলেন, “তাহলে আপনি আমাকে (আপনার নামে কিছু কথা বলার) অনুমতি দিন”। রাসুলুল্লাহ সাঃ তাকে অনুমতি দিলে তিনি কা’ব বিন আশরাফের নিকট গিয়ে বলেন, “এই ব্যক্তি (আল্লাহর রাসুল) আমাদের নিকট সাদাকা চাচ্ছে যে আমাদের ভীষণ কষ্টের মধ্যে নিক্ষেপ করেছে।” একথা শুনে কা’ব বলে, “আল্লাহর কসম তোমরা আরো বিরক্ত হবে”। এভাবে মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামা রাঃ উক্ত ইয়াহুদীর সাথে ভাব জমিয়ে একসময় তাকে বাড়ির বাইরে এনে হত্যা করেন।

মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামা রাঃ যে কথা বলেছিলেন স্বাভাবিক অবস্থায় এই ধরণের কথা বলা স্পষ্ট কুফরী হিসেবে গণ্য যেহেতু এতে রাসুল্লাহ সাঃ এর উপর অসন্তুষ্টি প্রকাশ করা হয়। একারণে আলেমদের একটি অংশ এই হাদীস থেকে অন্যান্য মুসলিমদের জান-মাল হেফাজতের জন্য শত্রুর নিকট কৌশল হিসেবে কুফরী কথা উচ্চারণের পক্ষে মত দিয়েছেন।

এই হাদীসের ব্যাখ্যায় আজিম আবাদী বলেন, ইবনে মুনীর বলেছেন, এখানে একটি সুক্ষ্ম বিষয় রয়েছে তা হলো, রাসুলুল্লাহ সাঃ সম্পর্কে অসঙ্গত কথা কুফরী আর কুফরী কথা উচ্চারণ করা কেবল তার জন্য বৈধ হয় যে বাধ্য হয়ে তা করে কিন্তু তার অন্তর ঈমানের উপর দৃঢ় থাকে। প্রশ্ন হলো, এখানে বাধ্যতা কোথায়? এর উত্তরে তিনি বলেন, আসলে কা’ব মুশরিকদের মুসলিমদের হত্যা করতে উৎসাহিত করতো। তাকে হত্যা করার মাধ্য মুসলিমদের এ থেকে রক্ষা করা সম্ভব ছিল। অতএব, অবস্থা যেনো এমন যে, সে মুসলিমদের নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে কুফরী কথা উচ্চারণ করতে বাধ্য করেছে ফলে তারা অন্তরে দৃঢ় ঈমান থাকা অবস্থায় মুখে কুফরী কথা উচ্চারণ করে নিরাপত্তা অর্জন করেছে।

এটা উল্লেখ করার পর আজিম আবাদী বলেন, “এই ব্যাখ্যাটি খুবই চমৎকার” (আওনুল মা’বুদ)

শাফেঈ মাজহাবের ফকীহ্ আস্ – সুবাকীও এই ঘটনার অনুরুপ ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। তিনি বলেন, এটা জানা কথা যে, বাধ্য হয়ে ছাড়া সাধারন অবস্থায় কাফিরদের পোশাক পরিধান করা এবং কুফরী কথা মুখে উচ্চারণ করা কুফরী। কিন্তু যদি মুসলিমদের স্বার্থ রাক্ষার জন্য কেউ একজন এমন করা অনিবার্য প্রয়োজন হয়ে দাড়ায় তবে এটা বাধ্য হওয়া বলে গণ্য হবে বলেই মনে হয়। (আল-আশবাহ্ ওয়ান-নাজায়ির)

এরপর তিনি কা’ব বিন আশরাফকে হত্যা করার সংক্রান্ত হাদীসটি এ বিষয়ে দলিল হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি এ বিষয়ে একটি ঘটনাও উল্লেখ করেন। তিনি বর্ণনা করেন, সুলতান সালাহ্ উদ্দিন আয়্যুবীর সময় একজন বাদশা মুসলিমদের মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাড়ালে সালাহ্ উদ্দিন আয়্যুবী দু’জন মুসলিমকে খৃষ্টানদের পোশাক পরিধান করিয়ে উক্ত রাজার দরবারে প্রেরণ করেন। তারা নিজেদের খৃষ্টান ধর্মের পাদ্রী হিসেবে পরিচয় দিয়ে রাজার নিকট গমণ করেন এবং সুযোগ বুঝে তাকে হত্যা করেন। এর মাধ্যমে মুসলিমদের নিরাপত্তা অর্জিত হয়।

ইমাম নাব্বী রঃ বলেন, যদি কেউ মাজায় কাফিরদের মতো ফিতা বাধে এবং কাফিরদের এলাকায় ব্যবসা করার জন্য গমণ করে তবে সে কাফির হবে(যেহেতু এর মাধ্যমে সে নিজেকে কাফির হিসেবে পরিচয় দিতে চাচ্ছে)। কিন্তু যদি সে বন্দি মুক্ত করার জন্য সেখানে যায় তবে কাফির হবে না। (রাওদাতুত তালেবীন)

অর্থাৎ সাধারনভাবে যেটা কুফরী মুসলিমদের নিরাপত্তা ও কারামুক্তির জন্য সে ধরণের কাজ করা কুফরী হিসেবে গণ্য হবে না।

কা’ব বিন আশরাফকে হত্যা করা সম্পর্কিত হাদীসটির ব্যাখ্যায় ইবনুল কায়্যিম রঃ বলেন,

এই ঘটনা অনেকের নিকট জটিল মনে হয়েছে, যেহেতু সাহাবায়ে কিরাম রাসুলুল্লাহ সাঃ এর নিকট তার সম্পর্কে কিছু অসঙ্গত কথা বলার অনুমতি প্রার্থনা করেছেন যা ঈমানের সাথে সংঘর্ষিক তবু রাসুলুল্লাহ সাঃ অনুমতি দিয়েছেন। (বাদাইউল ফাওয়াইদ)

এরপর তিনি এ বিষয়ে সংশয় নিরসনের জন্য কয়েকটি জবাব উল্লেখ করেছেন। প্রথমেই তিনি বলেন, মুসলিমদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এখানে বাধ্য হয়ে কুফরী কথা উচ্চারণ করা হয়েছে। এই মতটি বর্ণনা করার পর তিনি বলেন, “এই ব্যাখ্যাটি খুব বেশি শক্ত নয়”। এটা প্রমাণ করে ইবনুল কায়্যূম এই ব্যাখ্যাটি খুব বেশি পছন্দ না করলেও এটি পুরোপুরি অগ্রহণযোগ্য মনে করেন নি এবং উক্ত হাদীসটি এভাবে ব্যাখ্যা করা একেবারে অমূলক মনে করেন নি। যেহেতু হাদীসটিতে এই ব্যাখ্যার স্বপক্ষে স্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে এবং ওলামায়ে দ্বীনের একটি অংশ এ ব্যাখ্যা গ্রহণ করেছেন।

নিরপেক্ষভাবে চিন্তা করলে দেখা যাবে, কা’ব বিন আশরাফকে হত্যা করা সম্পর্কিত হাদীসটি ঐ সকল ওলামায়ে কিরামের পক্ষে দলিল যারা যুদ্ধ-বিগ্রহ বা অন্যান্য অনিবার্য প্রয়োজনে কুফরী কথা উচ্চারণের পক্ষে কথা বলেছেন। যেহেতু এখানে মুহাম্মাদ ইবনে মাসালামা রঃ ও অন্যান্য সাহাবায়ে কিরাম রাঃ নিজেদের জীবন বা সম্পদের কোনোরুপ ক্ষতির আশঙ্কা ছাড়াই অন্যান্য মুসলিমদের নিরাপত্তার স্বার্থে একজন কাফিরকে হত্যা করার জন্য কৌশল হিসেবে এমন কথা উচ্চারণ করেছেন যা সাধারন অবস্থায় উচ্চারণ করা কুফরী। অনেকে অবশ্য এ বিষয়ে ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। তারা এই ঘটনাকে ভিন্ন ভাবে ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তারা বলেন, এখানে সাহাবায়ে কিরাম যে কথা বলেছেন তা বাহ্যিকভাবে কুফরী মনে হলেও তারা অন্তরে এগুলোর ভিন্ন অর্থ উদ্দেশ্য করেছেন অন্য কথায় তারা আসলে তাওরিয়া হিসেবে এসব কথা বলেছেন। অতএব, এটাকে অনিবার্য কারণে কৌশল হিসেবে কুফরী কথা উচ্চারণের স্বপক্ষে দলিল হিসেবে পেশ করা যৌক্তিক নয়। যারা এই ব্যাখ্যা প্রদান করেন তারা ভুলে যান যে, বাধ্য হয়ে ছাড়া সাধারন অবস্থায় তাওরিয়া হিসেবে কুফরী কথা উচ্চারণ করাও কুফরী। আমরা পূর্বে এ বিষয়ে ওলামায়ে কিরামের বক্তব্য পেশ করেছি। তারা বলেছেন বাধ্য হলেও একজন মুসলিম কুফরী কথা উচ্চারণের ক্ষোত্রে যতদূর সম্ভব তাওরিয়া অবলম্বন করবে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ এ বিষয়ে এতটাই কড়াকড়ি করেছেন যে, তাওরিয়া ছাড়া সরাসরি কুফরী কথা উচ্চারণ করাকে তারা কোনো অবস্থাতেই ওযর হিসেবে গণ্য করেন নি। যুদ্ধ-বিগ্রহ বা অন্য কোনো অনিবার্য কারণে কুফরী কথা উচ্চারণের ক্ষেত্রেও মুসলিমরা একই পন্থা অবলম্বন করবে। তারা মুখে যা উচ্চারণ করছে অন্তরে তার বিপরীত অর্থ উদ্দেশ্য করবে। অতএব এই হাদীসটি তাদের ব্যাপারে স্পষ্ট দলিল হিসেবে গণ্য হবে। তাছাড়া আমরা ঈমান ভঙ্গের চতুর্থ কারণ তথা কুফরীর প্রতি সন্তোষ প্রকাশ করা সংক্রান্ত আলোচনাতে এ বিষয়ে ওলামায়ে কিরামের মতামত উল্লেখ করেছি যে, একজন ব্যক্তি বাধ্য হওয়া ছাড়াই স্বেচ্ছায় কুফরী কথা উচ্চারণ করলে সে কাফির হবে। তার অন্তরে কি উদ্দেশ্য আছে তা দেখা হবে না। একারণে ওলামায়ে কিরাম বলেছেন, এই হাদীসে যেসব কথা বলা হয়েছে তা সাধারন অবস্থায় বলা বৈধ নয়।

আজিম আবাদী রঃ বলেন, “এখানে যেসব কথা বলা হয়েছে এই ধরনের অবস্থায় ছাড়া তা উচ্চারণ করা নিশ্চিতভাবেই বৈধ নয়।” (আওনুল মা’বুদ)

ইবনে বাত্তাল রঃ বলেন, যদি এই সকল সাহাবায়ে কিরাম রাসুলুল্লাহ সাঃ এর অনুমতি না নিয়ে এটা করতো আর পরে তা জানা যেতো তাহলে প্রমাণিত হতো যে, তাদের অন্তরে নিফাকী আছে। (শারহে বুখারী)

ইবনে কায়্যিম রঃ বলেন, এই সকল কথা-বার্তা ঈমানের সাথে সাংঘর্ষিক। (বাদায়িউল ফাওয়াইদ)

মোট কথা, সাধারন অবস্থায় এই ধরণের কথা বলা যে কুফরী সে ব্যাপারে দ্বিমত করা যেতে পারে না। সুতরাং এই ঘটনা কৌশলগত কারণে নিরুপায় হলে বাধ্য হয়ে কুফরী করা বৈধ প্রমাণ করে।

কেউ কেউ বলেছেন, এই ঘটনায় রাসুলুল্লাহ সাঃ নিজেই তার সম্পর্কে কিছু অসঙ্গত কথা বলার অনুমতি প্রদান করেছেন। যদি কেউ নিজেই নিজের সম্পর্কে কিছু বলার অনুমতি প্রদান করে তবে তাতে কারো কিছু বলার থাকে না। নতুন করে যেহেতু রাসুলুল্লাহ সাঃ আর কারো জন্য অনুমতি দেবেন না তাই এখন আর এধরণের কাজ করা বৈধ হবে না। এই যুক্তিটি বিভিন্নভাবে খন্ডায়ন করা যায়। প্রথমত: এই ঘটনায় রাসুলুল্লাহ সাঃ কেবল নিজের সম্পর্কে অসঙ্গত কথা বলার অনুমতি দিয়েছেন তাই নয় বরং আল্লাহর দ্বীনের যে কোনো বিষয় নিয়ে মন্তব্য করার অনুমতি দিয়েছেন।

ইবনে হাযার আসক্বালানী রঃ বলেন, ইবনে সাদ এর বর্ণনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, রাসুলুল্লাহ সাঃ তাদের তার সম্পর্কে যে কোনো অভিযোগ করার ও তার মতামতকে ত্রুটিপূর্ণ আখ্যায়িত করার অনুমতি প্রদান করেছিলেন। (ফাতহুল বারী)

সাহাবায়ে কিরাম যেসব মন্তব্য করেছেন সেগুলোও কেবল রাসুলুল্লাহ সাঃ সম্পর্কে নয় বরং তার কিছু অংশ আল্লাহর দ্বীন সম্পর্কে। যেমন তারা বলেছেন, “তিনি তো আমাদের নিকট সাদাকা (যাকাত) চান” এই কথার মাধ্যমে আল্লাহর বিধান যাকাত সম্পর্কে বিরক্তি প্রকাশ করা হয়েছে। সুতরাং রাসুলুল্লাহ সাঃ কেবল নিজের সম্পর্কে কিছু বলার অনুমতি প্রদান করেছিলেন এটা সঠিক নয়। বরং আল্লাহর দ্বীনের যে কোনো বিষয় সম্পর্কে মন্তব্য করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।

তাছাড়া রাসুলুল্লাহ সাঃ এর অনুমতি নিয়ে এটা করা হয়েছিল এর মাধ্যমে এমন প্রমাণিত হয় না যে, রাসুলুল্লাহ সাঃ এর ওফাতের পর যেহেতু আর তার পক্ষ থেকে অনুমতি সম্ভব নয় তাই এখন আর এমন করার সুযোগ নেই। কেননা সাধারনবাবে যে কোনো বিষয়ে রাসুলুল্লাহ সাঃ এর অনুমতি কিয়ামত পর্য্ন্ত সকল মানুষের জন্য শরীয়ত স্বরুপ। প্রতিবার পৃথক পৃথক অনুমতির প্রয়োজন নেই বরং কোনো একটি ঘটনা প্রসঙ্গে একবার অনুমতি প্রদান করা হলে অনুরুপ ঘটনার ক্ষেত্রে উক্ত অনুমতি দলিল হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে এটিই সঠিক। সুতরাং যুদ্ধ কৌশল বা অন্য কোনো অনিবার্য কারণে কুফরী কথা বলা বা কুফরী কাজ করা বৈধ হবে এই মতই সঠিক। আর আল্লাহই ভাল জানেন।

যুদ্ধে কৌশল হিসেবে কুফরীর বিধান যুদ্ধে কৌশল হিসেবে কুফরীর বিধান যুদ্ধে কৌশল হিসেবে কুফরীর বিধান যুদ্ধে কৌশল হিসেবে কুফরীর বিধান

Leave a Reply

Your email address will not be published.