নব্য যুগের সভ্য ফকীর – বাংলা ইসলামিক কবিতা – bd islamic site

নব্য যুগের সভ্য ফকীর বাংলা ইসলামিক কবিতা
{পেশাদার বক্তাদের মুখোশ উন্মোচন}

ভোর সকালে স্টেশনে বসে কিছু লোক
তার মধ্যে একটি লোকের ফোলা দুটি চোখ।
এদিক ওদিক ঢলে পড়ে গভীর ঘুমের তালে।
মাথাটা তার ঝুকে এসে বুকের কাছে দোলে
রাতে বুঝি ঘুম হয়নি একটুখানি তার
রাত জেগে ব্যস্ত ছিল টাকা কামাবার।
কিন্তু এমন কিবা কাজ রাত বিরেতে হয়!
একটু ভেবে রনির মনে জেগে ওঠে ভয়।
চোর ডাকাতে রাত বিরেতে চুরি করে শুনি
অন্ধকারে মানুষ মেরে করে রাহাজানি।
রণির তখন মাথার মাঝে চিন্তা খেলা করে,
সত্যিই কি এই ব্যক্তি তেমন কিছু করে?
রনির মনে লজ্জা জাগে ভাবছে কি অযথা
আজকে কি তার সকাল বেলা খারাপ হলো মাথা?
চুরি ডাকাতি এই ব্যক্তি করবেনাকো বটে
পোশাক দেখে চোর ডাকু মনে হয়না মোটে।
মাথায় টুপি মুখে দাড়ি গায়ে লম্বা জামা
এমন লোককে চোর বললে হবে নাকো ক্ষমা।
কৌতুহলে রনি বলে সেই লোককে ধরে
বলূন দেখি কি কাম করেন রাত্রি দুপুরে?
সেই ব্যক্তি বিরক্তি আর রাগের বশে ফুসে
মোটা গলায় বলেন তাকে একটুখানি কেশে।
আমি একটা বক্তা শোনো বিশ্ব জোড়া নাম
ওয়াজ করি ঘুরে ফিরে এটাই আমার কাম।
দেশ বিদেশে আমার আছে ভক্ত শত শত
ভক্তি করে তারা মোরে পীর সাহেবের মতো।
কথা শুনে রনির মনে শ্রদ্ধা জাগে অতি
ভক্তির ভাব জেগে ওঠে সেই লোকটির প্রতি।
কত বড় আলেম তিনি কত সম্মান
দ্বীন দুনিয়ার সব বিষয়ে কত তার জ্ঞান!
রাত জেগে রবের দা’ওয়াত প্রচার করেন সদা
দ্বীনের তরে ত্যাগ করতে দেয়না মনে বাধা।
এই ব্যক্তি মহান অতি আল্লাহ ভীরু লোক
এই দুনিয়ার সম্পদে তার নেইকো কোনো ঝোক।
ধবধবে সাদা তার মনের পাতাখানা।
চুরি ডাকাতি দূর্ণিতি তাই ভাবতে পারে না।
এমন লোককে চোর বলে বেশ হয়েছে পাপ।
তাইতো রনি তার কাছে চেয়ে নিলো মাফ।
লোকটা যেনো এই কারণে সুযোগ পেয়ে যায়
মুখোস ছেড়ে বেড়িয়ে আসে আসল চেহারায়।
সব লোককে মন্দ বলে তুচ্ছ করে অতি
বিশ্বব্যপী তারই নাকি অনেক বেশি খ্যাতি।
সব বিষয়ে সব জান্তা ব্যক্তি নাকি সে
মহাকাশের খবর শোনায় মাটির উপর বসে।
গলা অবধি দেহ তার বু্দ্ধি জ্ঞানে ভরা।
মেলা রকম কেতাবাদি ঠেসে ঠেসে পুরা
রবের সাথে তার নাকি ভাব আছে খুবই
যেমন যেমন দোয়া করে পুরা করে সবই।
কঠিন কঠিন রোগী যারা অসুখ হয়ে মরে
তার তাবীজ গলায় দিলে কালই যাবে সেরে।
রণি তার সরল মনে সকল কথা শোনে
সন্দেহ করেনাকো মনের কোনো কোনে।
এতো বড় বুযুর্গ আর মহান মনিষী।
তার কাছে এসব কি আর খুব একটা বেশি!
ইশারায় রনিকে নিজের কাছে ডেকে।
আড় চোখে একটি বার দেখে নিলো তাকে।
তারপর কানের কাছে মুখটি এনে তার
চুপটি করে বলল এক করবো উপকার।
তোমার আছে ভীষণ এক গোপন কোনো রোগ
সামনে তোমার অপেক্ষায় চরম দুর্ভোগ।
আমার কাছে তাবীজ নিয়ে গলায় ভরে রাখো
কাল থেকে সব রোগ কোথায় পালায় দেখো।
রণি ভীষণ খুশি হয়ে মুচকি হেসে বলে
তাবীজ তো নেবোই আমি দয়া করে দিলে।
লোকটি তখন ব্যাগ থেকে তাবীজ তুমার খুলে
যত্ন করে ঝুলিয়ে দিল রণির খালি গলে।
মুচকি হেসে বলল শেষে লাগছে কেমন বলো
তাড়াতাড়ি এবার তুমি পাঁচশ টাকা ফেলো।
টাকার কথা শুনে রণীর মুখটা কালো হয়
এমন কথা বলা তো মোটেও ভালো নয়।
রনি হেসে বলে তাকে কিসের টাকা দেবো
পাঁচশ টাকা দিয়ে এই টিনের কোটো নেবো?
কথা শুনে সেই লোকটা ভীষণ রেগে যায়
এই তাবীজে অন্য জাগায় হাজার টাকা চায়।
তুমি আমার কাছের লোক তাই চেয়েছি কম
দামটা আমায় দিয়ে দাও নরম করো মন।
রণি বলে অত টাকা কোথায় আমি পাবো
কুড়ি টাকা এনেছি মামা বাড়ি যাবো।
লোকটি তখন চেচিয়ে বলে কুড়ি টাকাই দাও
মামার বাড়ি না গিয়ে বাড়ি ফিরে যাও।
রণি তখন তার হাতে কুড়ি টাকা দিয়ে
ভীষণ ভয়ে তাকিয়ে থাকে এক নজরে চেয়ে।
শুনেছিল গোন্ডা লোকে রাতে করে চুরি
এযে দেখি দিনের বেলায় গলায় বাধে দড়ি।
কিন্তু পাছে এই লোকটা বদ দোয়া দেয়
তাই তো রণি নিরবে সব হজম করে নেয়।
সব শেষে লোকটা বলে নাম্বারটা রাখো
কোথাও কোনো ওয়াজ হলে আমায় শুধু ডেকো।
একটু পরে ট্রেনে চড়ে লোকটা চলে যায়
টাকা নাই বলে রণি বাড়ি ফিরে যায়।
রণি ভাবে বাড়ি ফিরে মা যদি শোনে
ভীষণ জোরে মলা দেবে আমার দুটি কানে।
বাড়ি ফিরে ঘটনাটা অন্যরকম হলো
প্রথম দিকে রনির মা একটু রেগে গেলো।
কিন্তু শেষে সব শুনে খুশি মনে বলে
কুড়ি টাকায় এমন তাবীর আরকি দুটো মেলে?
লোকটি বড় সৎ লোক টাকায় নেই টান
কুড়ি টাকায় এমন তাবীজ তাই করেছে দান।
নাম্বারটা আমায় দে তুলে রাখি ঘরে
বাবার বাড়ি ওয়াজ আছে এই বছরে।


বড় চাচা সেই ওয়াজে সভাপতি হয়
আমার একটা কথা তিনি রাখবনে নিশ্চয়।
সেই ওয়াজে আমি নিজে হাজির হবো গিয়ে
তুই যাবি নানা বাড়ি আমায় সাথে নিয়ে।
কদিন পরে সব কিছু পাকা হয়ে গেলো
যোগাযোগের দায়িত্বটা রনিই তখন পেলো।
রনি যখন সব কথা বলল তাকে খুলে
সেই লোকটি মিষ্টি হেসে তখন তাকে বলে।
ওয়াজ হবে ভাল কথা খুশির খবর বটে
কিন্তু শোনো বিলটা জেনো দশ হজার মোটে।
অর্ধেকটা আগাম নেবো অর্ধেকটা বাকি
এসব কাজে আমি আবার নিই না মোটে ঝুকি।
খাবারের আয়োজন হয়না যেনো বেশি
যতটুকু প্রয়োজন তাতেই আমি খুশি।
দু’তিন পদের মাংস হবে মুরগি আর খাসি
দেখবে যেনো খাবারগুলো হয়না মোটে বাসি।
কুচি কুচি গাজর কেটে সালাত করো খাসা
খাওয়ার পরে পান চিবানো আমার আবার নেশা।
সকল দিকে খেয়াল রেখে আয়োজনটা করো
পরকালে তোমাদের সওয়াব হবে বড়ো।
সব শেষে একটু হেসে দিন তারিখ জেনে
ফোন লাইন কেটে দিলেন ভীষণ খুশি মনে।
এসব শুনে রনির মনে ভীষণ বয় হয়
এত টাকা কোথায় পাবে তার নানা ভাই?
কথা শুনে নানা বলে অট্টহাসি হেসে
তুই দেখি সেরা বোকা আমাদের এই দেশে।
টাকা কি আর আমি দেবো নিজের পকেট থেকে
যার টাকা সে তুলে নেবে মিষ্টি কথার ফাঁকে।
ধাঁধাঁয় পড়ে রনির যেনো ঘুরে যায় মাথা
যার টাকা সে তুলে নেবে এটা কেমন কথা!
কেমন করে তুলবে টাকা কেমন করে নেবে
তবে কি সে জাল মেশিনে টাকা ছাপাবে?
কি করে, কেমন করে দেখতে হবে সবই
রহস্যের জট খুলতে খুঁজতে হবে চাবি।
আজকের দিন ওয়াজ হবে সব কাজ শেষ
মাঠের কোনে মঞ্চটাও মানিয়েছে বেশ।
বিকেল হতেই দেখা গেলো বক্তা এসে হাজির
সাথে তার কয়েকজন আছে উজির নাজির।
লাট সাহেবের মতো এক জীপ গাড়িতে বসে
গায়ের পথে এসেছে ধুলোর উপর ভেসে।
আসার পরে যত্ন করে গদির উপর রেখে
তাকে লোকে ভক্তি করে রাখে চোখে চোখে।
হুজুর কখন কিবা খাবে কিবা আবার চায়
যখন যেটা লাগবে তারা এনে দেয় তাই।
ছাগল গরুর মতোই হুজুর খেয়ে চলে পান
মাঝে মাঝে চোখ বুঝে করে ধ্যানের ভান।
রাত যখন দশটা বাজে ওয়াজ শুরু হলো
মঞ্চে উঠে হুজুর তখন ভীষণ আওয়াজ দিলো।
ভাই, চাচা, বোন, আপা যে যা আছো হেথা
মন দিয়ে শোনো সবে আমার এই কথা।
জাহান্নামের আগুন তার বড়ই উত্তাপ।
সইতে কি পারবে কেউ কবরের ঐ চাপ?
সূর্যটা আসবে যখন মাথার কাছে নেমে
মাথার ঘিলু টগবগিয়ে ফুটবে গরমে
কথা শুনে সব মানুষে চেচিয়ে ওঠে ভয়ে
কথা যেনো কাটা হয়ে ফুটছে তাদের গায়ে।
সুযোগ বুঝে লোকটি তখন ঘুরায় তার চাকা
বলে ভাই, বাঁচতে হলে দান করো টাকা।
সাথে সাথে হাতে হাতে টাকা উঠতে থাকে
আমীন আমীন দোয়া চলে তার ফাঁকে ফাঁকে।
নারী পুরুষ, ছেলে বুড়ো সবাই করে দান
জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করে প্রাণ।
টাকা কড়ির ছড়াছড়ি নেইকো গননা
কত টাকা উঠলো তার হিসাব অজানা।
এর পরে দোয়া করে ওয়াজ হলো শেষ
রাত বিরেতের কারবারে লাভ হলো বেশ।
ওয়াজ শেষে হুজুর এসে মিঞা বাড়ি বসে
এক বৃদ্ধ মালা হাতে তার কাছে আসে।
আমি এক ফকীর বাবা অচল লোক বলে
এদিক সেদিক ভিক্ষা করে কোনো মতে চলে।
প্রতিদিন যাই পায় কম কিবা বেশি
তাই খেয়ে দিন রাত থাকি আমি খুশি।
এই এলাকায় আছে যারা ভিক্ষা করার দলে
ভিক্ষা করি মোরা সবে নানা রকম ছলে
কেউবা যায় একা একা কেউবা দলে মিলে
পরের ছেলে ভাড়া করে কেউবা রাখে কোলে।
কেউবা আবার গান বলে কেউবা সাজে বোবা
কেউ সাজে অন্ধ আর কেউবা হাবা গোবা।
ভিক্ষা করি আমরা সবে যে যার মতো চালে
নানা রকম ছলে বলে নানা কৌশলে।
লাভ তাতে হয়না কিছু শুধু পেটে খাওয়া
সারাদিনে সার হয় কেবল আসা যাওয়া।
কিন্তু তোমার এই পন্থা বড়ই চমৎকার
ওয়াজ করে কামিয়ে নিলে টাকারও পাহাড়।
গাড়ি বাড়ি করে তুমি মহা সুখে থাকো।
ভিক্ষা করো তবু কেউ ফকীর বলে নাকো
দেশি ফকীর ভাত পায় না তোমরা এলে পরে
নিজের পেট তোমরা ভরো মোদের ভাত মেরে।
যেদিন থেকে ওয়াজ হবে গাও গ্রামে রটে
সেদিন থেকে ভিক্ষা করা কঠিন হয় বটে।
সবাই বলে মোদের গায়ে ওয়াজ হবে বড়
সেই ওয়াজে টাকা দেবো তুমি এখন সরো।
বড় বড় নেতা যারা আছেন এই দেশে
আমরা গেলে তেড়ে আসে তোমরা গেলে হাসে।
বক্তা তখন রেগে উঠে বলে ভীষণ রোষে
আমি কি আর ভিক্ষা করি পড়ে লোভের বশে?
এসব টাকায় দ্বীন দুনিয়ার অনেক কাজ হয়
মাদ্রাসা আর মসজিদ হয় কত জায়গায়।
ফকীর বলে সেসব তো নেক কাজই বটে
কিন্তু বলো কত টাকা ঢোকে তোমার পেটে?
দ্বীনী কাজের দোহাই দিয়ে টাকা কামিয়ে
নিজের নামে হিসাব খুলে রাখো জমিয়ে।
বক্তা বলে নিজের জীপে এলাম এতো দূরে
বল দেখি তেল খরচে কত টাকা পড়ে?
ফকীর বলে ড্রাইভারটা আমার চাচার ছেলে
তার গাড়ি ভাড়া করে দু-চার কিলো এলে
এখন বলো, নিজের গাড়ি ডাহা মিথ্যা কথা
জোচ্চুরিটা দেখে আমার ঘুরে যায় মাথা।
ভিক্ষা করার নয়া মডেল নতুন আবিষ্কার
অর্থনিতীর উপর পাবে নবেল পুরষ্কার।
সকল ফকির হেরে গেলো তোমার নয়া চালে
তাই এসেছি মালা দিতে আজকে তোমার গলে।
তোমার পায়ে সালাম করি তুমি মোদের লাট।
নব্য যুগের সভ্য ফকীর, ভিক্ষুক সম্রাট।

যুগের সভ্য ফকীর-বাংলা ইসলামিক কবিতা-bd islamic site

কবিতাটিভন্ডহুজুরকবিতাগ্রন্থের_অন্তর্ভুক্ত

ভিজিট করতে এখানে ক্লিক করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.