ঈমান ও ইসলাম – শায়েখ আব্দুল্লাহ আল মুনীর

ঈমান ও ইসলাম অর্থ – শায়েখ আব্দুল্লাহ আল মুনীর এর তাওহীদ আর রহমান গন্থ থেকে সংকলন করা হয়েছে

শব্দিকভাবে ঈমান অর্থ বিশ্বাস। পারিভাষিকভাবে ঈমান বলতে কি বোঝায় সে বিষয়ে উপরে আলোচনা করা হয়েছে। আমরা দেখেছি শাব্দিকভাবে ঈমান অর্থ বিশ্বাস হলেও পারিভাষিকভাবে ঈমান বলতে অন্তরের বিশ্বাসের সাথে সাথে মুখে স্বীকার করা এবং আমলে পরিনত করাকে বোঝায়। তবে ঈমান শব্দটি দুটি অর্থে ব্যাবহৃত হয়। মৌলিকভাবে যতটুকু ঈমান আনলে একজন ব্যাক্তি কাফির হওয়া থেকে বেঁচে যায় ততটুকু ঈমান। এবং পরিপূর্ণ ঈমান। আমলে পরিনত করা প্রথম প্রকার ঈমানের জন্য শর্ত নয়। কিন্তু যে প্রকারের ঈমান পরিপূর্ণ হিসেবে গণ্য এবং যার উপর নির্ভর করে একজন ব্যক্তিকে প্রশংসার স্বরে মুমিন ব্যক্তি হিসেবে আখ্যায়িত করা যায় তার জন্য আমল শর্ত। সুতরাং ঈমান বলতে বোঝায়, আল্লাহ তার রাসুলের উপর যা কিছু অবতীর্ণ করেছেন তা মনে প্রাণে বিশ্বাস করা এবং মুখে স্বীকার করা। একজন ভাল মুমিন হওয়ার জন্য এর সাথে সাথে আমল করাও শর্ত।

একইভাবে ইসলাম অর্থ আত্মসমর্পণ করা। এটা শাব্দিক ব্যাখ্যা। পরিভাষায় ইসলাম বলতে বোঝায় আল্লাহর দ্বীন তথা আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ যাবতীয় বিধি-বিধান ও আইন-কানুন। ইসলাম গ্রহণ  করতে হলে ঐ সকল বিধি-বিধানকে অন্তরে বিশ্বাস করতে হবে এবং মুখে স্বীকার করতে হবে। একজন ভাল মুসলিম হওয়ার জন্য অন্তরের বিশ্বাস ও মৌখিক স্বীকৃতির পাশা-পাশি ঐ সকল বিধি-বিধানের উপর আমলও করতে হবে। সামান্য চিন্তা করলেই অনুধাবন করা সম্ভব হবে যে, ঈমান ও ইসলাম মূলত একই বিষয়কে বোঝাচ্ছে।

অনেকে মনে করেন ইসলাম বলতে যেহেতু বাহ্যিকভাবে আত্মসমর্পণ করা বোঝায় তাই মুসলিম হওয়ার জন্য বাহ্যিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া ও আমল করাই যথেষ্ট্য অন্তরে বিশ্বাস করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু এ ধারণা সঠিক নয়। শারয়ী পরিভাষায় অন্তরে বিশ্বাস ছাড়া একজন ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করেছে বা মুসলিম হয়েছে একথা বলা যায় না। রাসুলুল্লাহ সাঃ এর বিভিন্ন হাদীসে মুসলিম শদ্বটি যে অন্তরে বিশ্বাস করে এবং মুখে স্বীকার করে তার ক্ষেত্রেই ব্যাবহার করা হয়েছে।

রাসুলুল্লাহ সাঃ বলেন, “মুসলিম ছাড়া কেউ জান্নাতে প্রবেশ করবে না” (সহীহ বুখারী) আরেকটি হাদীসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাঃ বলেছেন, “এমন দুটি আমল রয়েছে যদি কোনো মুসলিম সেটা নিয়মিত আদায় করে তবে জান্নাতে প্রবেশ করবে” এরপর তিনি দুটি দোয়া শিক্ষা দিয়েছেন। (আবু দাউদ) সন্দেহ নেই যে, এখানে মুসলিম বলতে এমন কাউকে বোঝানো হচ্ছে না যে বাহ্যিক ভাবে ইসলাম গ্রহণ করেছে কিন্তু তার অন্তরে ঈমান নেই। যেহেতু এমন ব্যক্তি মুনাফিক হিসেবে গণ্য আর মুনাফিক জান্নাতে প্রবেশ করবে না বরং জাহান্নামের সর্ব নিকৃষ্ট স্তরে থাকবে। (সুরা নিসা-১১৫)

এছাড়া অন্য বিভিন্ন হাদীসে মুসলিম ব্যক্তির বিভিন্ন মর্যাদা ও সম্মানের কথা বর্ণিত আছে যা এমন কোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যায় না যে মুমিন নয়। এসব বর্ণনা প্রমান করে যে, শরীয়তের দৃষ্টিতে মুসলিম বলতে তাকেই বোঝায় যে বাহ্যিকভাবে ইসলাম গ্রহণ করেছে এবং তার অন্তরেও ঈমান রয়েছে। যার অন্তরে ঈমান নেই সে মুসলিম হতে পারে না যদিও সে মুসলিম হওয়ার ভান করে। অর্থাৎ ঈমান ও ইসলাম মূলত একই জিনিস। উভয়ের একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি কল্পনা করা যায় না। ফিকহে আকবারে বলা হয়েছে,

শাব্দিকভাবে ঈমান ও ইসলামের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে তবে (শরীয়তের পরিভাষায়) ইসলাম ছাড়া ঈমান হতে পারে না এবং ঈমান ছাড়া ইসলাম হতে পারে না অতএব এ দুটি বিষয় একই ব্যক্তির পিঠ ও পেটের মতো একে অপরের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।

ইবনে বাত্তাল রঃ আল-মুহাল্লাব থেকে উল্লেখ করেন, প্রকৃত অর্থে ইসলামই হলো ঈমান অর্থাৎ অন্তরে বিশ্বাস স্থাপন করা এবং মুখে স্বীকৃতি দেওয়া। এ বিষয়ে তারা বিভিন্ন দলিল প্রমানও উপস্থাপন করেছেন। যেমন আল্লাহর বাণী, যে ঈমানদাররা তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না। (সুরা আলে ইমরান-১০২)

অনেকে মনে করেছেন এই আয়াতে যেহেতু মুমিনদের মৃত্যুর আগে মুসলিম হতে আদেশ করা হচ্ছে এর অর্থ মুমিন হওয়ার পরও একজন ব্যক্তি মুসলিম নাও হতে পারে। একারণে মুমিনদের মুসলিম হওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে।

এ আয়াতে আসলে এমন কিছু বোঝানো হচ্ছে না বরং এ আয়াতে যারা ঈমান এনেছে এবং ইসলাম গ্রহণ করেছে তারা যেনো মৃত্যু পর্য্ন্ত এর উপর টিকে থাকে অর্থাৎ মুমিন ও মুসলিম অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে সেই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কেননা যে ব্যক্তি ইসলমা গ্রহণ করে কিন্তু মৃত্যুর আগে ঈমান পরিত্যাগ করে কাফির অবস্থায় মারা যায় তার পূর্বের ঈমান আনা কোনো কাজে আসে না। একারণে বলা হয়েছে যারা ঈমান এনেছো তারা যেনো মৃত্যুর পূর্বে ঈমান পরিত্যাগ করো না বরং ঈমানের উপর টিকে থেকে মৃত্যুবরণ করো। সুতরাং ঈমান ও ইসলাম এখানে একই অর্থে ব্যাবহার করা হয়েছে। ভিন্ন অর্থে নয়। যেমন অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, “হে ঈমানদাররা তোমরা আল্লাহ্ ও রাসুলের প্রতি ঈমান আনো। (সুরা নিসা-১৩৬) এ আয়াতে যারা ঈমান এনেছে পুনরায় ঈমান আনতে আদেশ করা হয়েছে। এর ব্যাখ্যায় মুফাসসিরীনে কিরাম বলেছেন যারা ঈমান এনেছে তাদের আজীবন ঈমানের উপর টিকে থাকতে আদেশ করা হয়েছে। (বাইদাবী)

বিপরীত দিকে অন্য একটি আয়াতে বলা হয়েছে, গ্রাম্য লোকেরা বলে, আমরা ঈমান এনেছি, আপনি বলুন তোমরা তো ঈমান আনোনি বরং তোমরা বলো আমরা মুসলিম হয়েছি। তাদের অন্তরে এখনও ঈমান প্রবেশ করেনি। (সুরা হুজরাত-১৪)

এই আয়াতটির মাধ্যমে প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয়, ইসলাম গ্রহণ করলেই ঈমান আনা হয় এমন নয়। বরং এমনও হতে পারে যে, একজন ব্যক্তি মুসলিম কিন্তু এখনও তার অন্তরে ঈমান প্রবেশই করে নি।

প্রকৃত ব্যাপার হলো, এই আয়াতে ইসলাম শদ্বটির শাব্দিক অর্থে অর্থাৎ অন্তরে বিশ্বাস না থাকলেও কেবল বাহ্যিকভাবে কোনো কিছু মেনে নেওয়া তথা আত্মসমর্পন করা অর্থে প্রয়োগ করা হয়েছে প্রকৃত অর্থে নয়। যেহেতু প্রকৃত অর্থে ইসলাম হচ্ছে আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিল হওয়া দ্বীন। যে এই দ্বীনের যাবতীয় বিষয়াবলী মেনে নেয় সেই মুসলিম। আর যে এই দ্বীনের কোনো কিছু অস্বীকার করে সে মুসলিম নয়। এটা নাযিল হওয়া একটি বিধান সুতরাং আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিল হওয়ার যাবতীয় বিধানাবলীর প্রতি অন্তরে বিশ্বাস স্থাপন করাও আল্লাহর দ্বীন ইসলামের একটি অংশ অর্থাৎ ঈমান ইসলামের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত। ঈমান বাদ দিয়ে ইসলাম হতে পারে না।

ইবনে বাত্তাল রঃ উল্লেখ করেন,

এই আয়াত প্রামণ করে, ইসলাম শদ্বটি কখনও কখনও আত্মসমর্পন অর্থেও ব্যাবহার করা হয় সেক্ষেত্রে সেটা ইমান আনা বলে গণ্য হবে না কেননা আল্লাহ বলেছেন “তাদের অন্তরে এখনও ঈমান প্রবেশ করে নি” অতএব, এই দৃষ্টি কোন থেকে ঈমান আনলে ইসলাম গ্রহণ করা বলে গণ্য হবে কিন্তু ইসলাম গ্রহণ করলে ঈমান আনা বলে গণ্য হবে না। তবে এটা ইসলামের প্রকৃত অর্থ নয় যেহেতু প্রকৃত অর্থে ইসলাম ও ঈমান একই জিনিস। (শারহে বুখারী)

উপরে ঈমান শদ্বটির যে দুটি অর্থ বর্ণনা করা হয়েছে অর্থাৎ প্রকৃত ঈমান আর পরিপূর্ণ ঈমান তার আলোকেও উপরোক্ত আয়াতটির ব্যাখ্যা প্রদান করা যায়। অর্থাৎ এখানে তোমরা ঈমান আনো নি এর অর্থ হচ্ছে তোমাদের ঈমান এখনও পরিপূর্ণ ও প্রশংসিত পর্যায়ে পৌছায় নি। অন্য একটি হাদীসে এসেছে একজন ব্যক্তি বললেন, “আমি অমুককে মু’মিন মনে করি” রাসুলুল্লাহ সাঃ তাকে বলেন, “বলো মুসলিম মনে করিঃ (বুখারী ও মুসলিম) অর্থাৎ তিনি একজন ব্যাক্তিকে মুমিন বলতে নিষেধ করেছেন বরং মুসলিম বলতে নির্দেশ দিয়েছেন।

উপরোক্ত আয়াতের সাথে এই হাদীসটির সাদৃশ্য রয়েছে। এই হাদীসটির মাধ্যমে অনেকে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন ঈমান ও ইসলাম আলাদা জিনিস। একজন ব্যাক্তি মুসলিম হলেই যে সে মুমিন হবে এমন নয়। কিন্তু এখানে ইমানের দ্বীতিয় অর্থ তথা পরিপূর্ণ ঈমান উদ্দেশ্য প্রকৃত অর্থে যে ঈমান কুফরীর বিপরীতে ব্যাবহার করা হয় সে ঈমান নয়। রাসুলুল্লাহ সাঃ উক্ত ব্যাক্তিকে সতর্ক করে দিয়েছেন যাতে তিনি যাকে-তাকে মু’মিন হিসেবে সম্মোধন না করেন যতক্ষণ না তার আমল-আখলাকের মধ্যে প্রশংসিত ও সন্তোষজনক গুণাবলী দেখতে পাওয়া যায়। এছাড়া কারো মুমিন হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চয়তা প্রদান করার ব্যাপারেও এই হাদীসে সতর্ক করা হয়েছে। যেহেতু ঈমান অন্তরের বিষয় তাই সে ব্যাপারে নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব নয়।

মাম নাব্বী রঃ বলেন, এই হাদীস প্রমাণ করে, যে বিষয়ে নিশ্চিতভাবে জানা সম্ভব নয় সে বিষয়ে নিশ্চয়তা প্রদান করা উচিৎ নয়। (শারহে মুসলিম)

ই হাদীস প্রমাণ করে যে, নির্দিষ্টভাবে কারো ব্যাপারে জান্নাতের গ্যারন্টি দেওয়া যাবে না কেবল তারা ছাড়া যাদের ব্যাপারে স্পষ্ট দলিল-প্রমান রয়েছে যেমন আশারে মুবাশশারা। এ বিষয়ে আহলুসসুন্নাহ ওয়াল জামায়া ঐক্যমত পোষণ করেছেন। (শারহে মুসলিম) সুতরাং এই হাদীসটি নিশ্চিতভাবে কারো অন্তরে ঈমান আছে এমন স্বাক্ষ্য দেওয়া বা প্রশংসার স্বরে পাপাচারী ব্যক্তিকে মুমিন হিসেবে আখ্যায়িত করার ব্যাপারে প্রযোজ্য। সাধারনভাবে কাউকে মুমিন বলতে এখানে নিষেধ করা হচ্ছে না এবং প্রকৃত অর্থে ঈমান ও ইসলামের মাঝে কোনো পার্থক্য করাও এখানে উদ্দেশ্য নয়। উপরোক্ত আলোচনার আলোকে বলা যায় ঈমান ও ইসলাম বলতে বোঝায় আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিল হওয়া প্রতিটি বিধি-বিধান মেনে নেওয়া। অন্য কথায় আল্লাহর দ্বীন কবুল করাই হলো ঈমান আনা ও ইসলাম গ্রহণ করা। সুতরাং উপরে দ্বীন সম্পর্কে যে আলোচনা করা হয়েছে ঈমান ও ইসলামরে বিষয়টিও মূলত তাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published.