ইসলামে গনতন্ত্র এর বিধান – বর্তমান সময়ে প্রচলিত কুফরী মতবাদ সমূহ – শায়েখ আব্দুল্লাহ আল মুনীর

ইসলামে গনতন্ত্র এর বিধান – বর্তমান সময়ে প্রচলিত কুফরী মতবাদ সমূহ – শায়েখ আব্দুল্লাহ আল মুনীর এর তাওহীদ আর রহমান গ্রন্থ হতে সংকলন করা হয়েছে

গণতন্ত্র ধর্মনিরপেক্ষতার উপর প্রতিষ্ঠিত একটি মতবাদ। ধর্মনিরপেক্ষতা হলো ধর্মকে অস্বীকার ও স্বীকার করার মাঝা-মাঝি একটি মতবাদ। এই মতবাদ ব্যক্তিগত পর্যায়ে এবং সীমীত পরিসরে ধর্ম পালনের অনুমতি দেয় কিন্তু রাষ্ট্রের সাথে সংশ্লিষ্ট যাবতীয় কার্যাবলীতে ধর্মের কোনো প্রভাব স্বীকার করে না। দেশের আইন-কানুন, শাসক ও শাসনপদ্ধতি ইত্যাদি যাবতীয় বিষয়কে ধর্মের ধরা-ছোয়ার বাইরে নিয়ে যাওয়াই মূলত ধর্মনিরপেক্ষতা। গণতন্ত্র এর উপরই প্রতিষ্ঠিত। দুটি দিক থেকে গণতন্ত্র ধর্মনিরপেক্ষতার চর্চা করে। সামাজিকভাবে গণতন্ত্র সকল ধর্মের লোকদের সমান অধিকার নিয়ে একত্রে এক জাতি হিসেবে বসবাস করার নির্দেশ প্রদান করে। একে অপরের ধর্ম-কর্মের প্রতি শ্রদ্ধা-সম্মান প্রদর্শন এবং নিজেদের ধর্মীয় ভেদা-ভেদ ভুলে মানুষ হিসেবে বা একটি রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে সমান অধিকার নিয়ে পরস্পরে ভাই-ভাই হিসেবে বাস করার কথা বলে। একজন মুসলিম একজন হিন্দু অপেক্ষা উত্তম নয়। ধর্ম, পেশা, নেক আমল ইত্যাদি কোনো কিছুই শ্রেষ্টত্বের মানদন্ড নয়। মুসলিম, হিন্দু, নেককার, বদকার সকলকে সমান দৃষ্টিতে বিবেচনা করার নামই গণতন্ত্র।

রাষ্ট্রীভাবে গণতন্ত্র বলতে বোঝায় একটি দেশের বেশিরভাগ লোক যেভাবে চাই সেভাবে সরকার গঠিত হওয়া এবং তাদের ইচ্ছামত আইন-কানুন ও নিয়মনীতিতে দেশ পরিচালনা করা। যদি বেশিরভাগ লোকের ভোটে একজন মদ্যপ, ব্যাভিচারী নির্বাচিত হয় তবু সে-ই বৈধ শাসক হিসেবে গণ্য হবে এবং তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা রাষ্ট্রদ্রোহীতা বলে গণ্য হবে। আর যদি একজন নেককার শাসক নির্বাচন ছাড়া অন্য কোনোভাবে শাসন ক্ষমতা গ্রহণ করে তবে তার কাজ-কর্ম ও নিয়মনীতি যতই উত্তম হোক তাকে অবৈধ শাসক হিসেবে গণ্য করা হবে এবং তাকে পদচ্যুত করার জন্য আন্দোলন করা বৈধ হবে। দেশের মানুষ যদি গর্ভপাত, জেনা-ব্যাভিচার, সমকামিতা, মদপান ইত্যাদি অশ্লীল কাজ করার পক্ষে রায় দেয় তবে সেটা বৈধ হিসেবে বিবেচিত হবে। মোট কথা গণতন্ত্রের দৃষ্টিতে ধর্ম-কর্ম, নীতিবাক্য ইত্যাদি কোনো কিছুর মূল্য নেই বরং নিজের খেয়াল-খুশি অনুযায়ী মানুষ যা করতে চায় তাকে তাই করার সুযোগ দেওয়ার নামই হলো গণতন্ত্র। অনেকে মনে করে, জনগণের কল্যাণ করা এবং তাদের সেবা করার নামই গণতন্ত্র। এই ধারনা সঠিক নয়। কাউকে তার খেয়াল-খুশি অনুযায়ী মানুষ যা করতে চায় তাকে তাই করার সুযোগ দেওয়ার নামই হলো গণতন্ত্র। অনেকে মনে করে, জনগনের কল্যাণ করা এবং তাদের সেবা করার নামই গণতন্ত্র। এই ধারনা সঠিক নয়। কাউকে তার খেয়াল-খুশি মতো চলতে দেওয়া অর্থ তার কল্যান করা নয়। যদি পিতা-মাতা তাদের সন্তানকে নিজের খেল-তামাশা করার সুযোগ দেয় তবে এটা উক্ত সন্তানের কল্যাণ বয়ে আনবে না বরং তাকে ধ্বংস করবে। আদর-সোহাগের পাশাপাশি শাসন করা এবং খেয়াল-খুশি মতো চলার ব্যাপারে সীমাবদ্ধতা আরোপ করাই প্রকৃত কল্যাণ কামনা করা। পিতা-মাতা অপেক্ষা শাসকের দায়িত্ব অনেক বেশি। যেহেতু পিতা-মাতা বড়জোর পাঁচ সাত সন্তানের দেখা-শোনা করে আর একজন শাসক রাষ্ট্রের কোটি-কোটি জনতার দেখ-ভাল করেন। সাধারন মানুষের মধ্যে নানা রকম চরিত্র ও বৈশিষ্ট্যির লোক থাকে। যদি এই সুবৃহৎ মানবগোষ্টীকে তাদের ইচ্ছামত চলার সুযোগ দেওয়া হয় তবে তাকে কিরকম অনিষ্ট ও দুর্যোগের সৃষ্টি হবে তা বর্তমান সময়ের গণতান্ত্রিক দেশগুলোর দিকে দৃষ্টি দিলে সহজেই অনুমান করা সম্ভব হবে। গণতন্ত্রের প্রকার প্রকৃতি ও কার্যপ্রণালী সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা এখানে উদ্দেশ্য নয়। ইসলামের সাথে গণতন্ত্রের পার্থক্য এবং গণতন্ত্রের মাধ্যমে ইসলাম প্রতিষ্ঠার চেষ্ট করা বৈধ কিনা সেসব বিষয়েও এখানে আলোচনা করবো না। (গণতন্ত্র সম্পর্কে ইসলামের রায়, ইসলামী গণতন্ত্রের স্বরুপ, খেলাফতের সঠিক রুপরেখা ও দ্বীন কায়েমের সঠিক পথ সম্পর্কে “ভেজালে মেশাল” নামক পৃথক একটি গন্থে বিস্তারিত আলোচনা করেছি।) এখানে আমরা গণতন্ত্রের মধ্যে যতটুকু কুফরী চিন্তাধারা রয়েছে সে সম্পর্কে আলোচনা করবো। সন্দেহ নেই যে, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান রয়েছে। ব্যক্তিগত জীবনে একজন মুসলিম যেমন ইসলামী অনুশাসন মেনে চলতে বাধ্য রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেতেও ইসলামী বিধি-বিধানের আনুগত্য করা প্রতিটি মুসলিমের অবশ্য কর্তব্য। আমরা পূর্বে আলোচনা করেছি যে, ইসলামের বিধি-বিধানের যে কোনো অংশ অস্বীকার করা স্পষ্ট কুফরী। সে হিসেবে গণতন্ত্র একটি কুফরী মতবাদ যেহেতু এ মতবাদ রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে ইসলামী বিধি-বিধানের আনুগত্য স্বীকার করে না। তাছাড়া সকল ধর্মকে শ্রদ্ধা-সম্মান করা এবং সকল ধর্মের মানুষকে সমান দৃষ্টিতে দেখাও একটি কুফরী চিন্তাধারা যে বিষয়ে আমরা মানবতাবাদ সম্পর্কিত আলোচনাতে উল্লেখ করেছি। অতএব, যদি কেউ গণতন্ত্রের এই মূলনীতিটি মেনে নেয় যে, ধর্মীয় পরিচয়কে উপেক্ষা করে সকল মানুষকে সমান দৃষ্টিতে দেখা উচিৎ এবং কোনো একটি দেশের বেশিরভাগ লোক যে ধরণের শাসক ও শাসনব্যাবস্থা চায় উক্ত এলাকাতে ঐ ধরণের শাসনব্যাবস্থা থাকা উচিৎ এ বিষয়ে ইসলাম বা অন্য কোনো ধর্ম কি বলল, সেটা দেখার বিষয় নয় বরং জনমত যেদিকে রায় দেবে সেটাই মেনে চলতে হবে। যদি কোনো এলাকার বেশিরভাগ লোক ইসলামের বিপরীত বিধান চায় তবে তাদের সে অধিকার দিতে হবে। তাদের উপর ইসলামে বিধান চাপিয়ে দেওয়া অনুচিত হবে। তবে এই ব্যক্তি কাফির হবে যেহেতু সে এই সকল মতবাদে বিশ্বাস করার মাধ্যমে ইসলামের একাধিক সুস্পষ্ট বিধানকে অস্বীকার করছে।

এটা অত্যন্ত সুস্পষ্ট যে, ইসলাম নিজেকে মহাবিশ্বের প্রতিপালক মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ একমাত্র জীবন বিধান হিসেবে দাবী করে। ইসলাম ছাড়া অন্য সকল বিধি-বিধান ও মতবাদ বিভ্রান্তি ছাড়া কিছু নয়। সুতরাং ইসলামের বিপরীত কোনো ধর্ম বিশ্বাস বা মতবাদকে শ্রদ্ধা করা প্রশ্নই আসতে পারে না। এটা ইসলামের মৌলিক শিক্ষার মধ্যে একটি যে, মুমিন ও কাফির কখনও সমান হতে পারে না।

আল্লাহ্ বলেন, মুমিন আর অবাধ্য (কাফির) কি সমান হতে পারে! কখনও নয়। (সুরা সাজদা-১৮)

এটাও ইসলামের একটি সুষ্পষ্ট ঘোষণা যে, ইসলামী বিধি-বিধান মহাবিশ্বের প্রতিপালক মহান আল্লাহর পক্ষ হতে বির্ধারিত একমাত্র সত্য ও সঠিক নিয়মনীতি। রাষ্ট্রীয় বা ব্যক্তিগত যে কোনো পর্যায়ে কেবলমাত্র ইসলামী নিয়মনীতি কার্যকর করার মাধ্যমেই সফলতা পাওয়া সম্ভব। ইসলাম অন্য কোনো ধর্ম বা মতবাদকে বৈধতা দেয় না, স্বাধীনভাবে টিকে থাকার অধিকারও দেয় না। বরং অন্য সকল ধর্মের লোকদের হয়তো সম্পূর্ণভাবে টিকে থাকার অধিকারও দেয় না। বরং অন্য সকল ধর্মের লোকদের হয়তো সম্পূর্ণভাবে ইসলাম মেনে নিতে হবে অর্থাৎ নিজের ধর্ম পরিত্যাগ করে ইসলাম গ্রহণ করতে হবে অথবা অপমানিত অবস্থায় জিজিয়া প্রদানের মাধ্যমে আংশিকভাবে ইসলামের বিধান মেনে নিতে হবে। সেক্ষেত্রে তাদের সীমীত পরিসরে নিজের ধর্ম পালনের সুযোগ দেওয়া হবে স্বাধীন ও সম্পূর্ণভাবে। পূর্বে “জিজিয়া” সংক্রান্ত আলোচনাতে আমরা বিস্তারিত দলিল প্রমাণ সহ এসব বিষয়ে আলোচনা করেছি। একজন ব্যক্তি যদি নিজের বাড়িতে কিছু দরিদ্র লোককে আশ্রয় দেয় তবে আশ্রিতের সংখ্যা যতই বেশি হোক উক্ত বাড়িতে বাড়ির মালিকের নির্দেশই যে পালিত হবে এটাই স্বাভাবিক। অনুরুপভাবে এই মহাবিশ্বের স্রষ্টা ও প্রতিপালক যেহেতু আল্লাহ্ তাই এখানে তারই বিধান মেনে চলতে হবে। যেসব মানুষকে তিনি নিজে হাতে সৃষ্টি করেছেন এবং দয়া করে এই পৃথিবীতে বসবাস করতে দিয়েছেন তারা সকলে যদি আল্লাহর আইনের বিরুদ্ধাচারন করতে চায় তবু তাদের মতামতদের গুরুত্ব দেওয়া হবে না বরং তাদের সকলকে আল্লাহর বিধান মেনে চলতে বাধ্য করা হবে। স্রষ্টার আদেশের বিপরীতে সৃষ্টির খেয়াল-খুশির কোনোই মূল্য নেই তারা সংখ্যায় যতই হোক। মহান রাব্বুল আলামীন দ্ব্যার্থহীনভাবে বলেন, “নিশ্চিয় সৃষ্টি করেছেন তিনি বিধানও তার।” (সুরা আরাফ-৫৪)

অন্য আয়াতে এসেছে, তিনি সৎপথ ও সত্য দ্বীন সহকারে রসুল প্রেরণ করেছেন, যাতে এই দ্বীনকে অন্য সকল দ্বীনের উপর বিজয়ী করেন যদিও কাফিররা এটা অপছন্দ করে। (তাওবা-৩৩)

সুতরাং যারা আল্লাহর দ্বীনকে অপছন্দ করে তাদের সংখ্যা যাই হোক সৃষ্টির উপর স্রষ্টার আইনই চলবে। এটাই ন্যায়সঙ্গত দাবী। ভাড়াটেদের সংখ্যা বেশি হলেই তারা বাড়ির মালিক হয়ে যায় না। একইভাবে কাফির-মুশরিক ও ইসলামের শত্রুদের সংখ্যা বেশি হলেই তাদের কার্য্কলাপ বৈধ হয়ে যায় না। ইসলামের এই সুস্পষ্ট রায়ের বিপরীতে যারা সকল ধর্ম ও মতবাদকে সমান মনে করে এবং বেশিরভাগ লোক যা বলে সেটির অনুসরণ করা উচিৎ এই চিন্তাধারাতে বিশ্বাস করে তারা আল্লাহর দ্বীনকে অস্বীকার করার কারণে কাফিরে পরিনত হয়।

বর্তমানে এমন কিছু লোক রয়েছে যারা গণতন্ত্রের এই সকল কুফরী তন্ত্র-মন্ত্রকে স্বীকার করে না তবে কৌশলের দোহায় দিয়ে তারা গণতান্ত্রিক রাজনীতিকে ইসলাম প্রতিষ্ঠার পন্থা হিসেবে গ্রহণ করেছে। তাদের এই কর্মপন্থার ভ্রান্তি সম্পর্কে আমরা ভিন্ন স্থানে সুবিস্তারে আলোচনা করেছি। এখানে কেবল এতটুকু বলাই যথেষ্ট্য যে, গণতন্ত্রের যেসব চিন্তাধারা ইসলামের বিপরীত সেগুলোকে যদি কেউ স্বীকার না করে তবে তাকে কাফির বলা যাবে না। ভ্রান্ত ও পথভ্রষ্টতাতে লিপ্ত যে কাউকে কাফির বলা যাবে না যতক্ষণ না সে স্পষ্ট কোনো কুফরী কাজে লিপ্ত হয়। এই হচ্ছে কুফরী মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত বর্তমান সময়ের প্রচলিত ও প্রশিদ্ধ কিছু মতবাদ ও চিন্তাধারা। এ ছাড়া আরও অনেক মতবাদ রয়েছে ভবিষ্যতেও নতুন-নতুন কুফরী মতবাদ সৃষ্টি হতে পারে সেগুলোর প্রত্যেকটির উপর পৃথকভাবে আলোচনা করা সম্ভব নয় তার প্রয়োজনীয়তাও নেই যেহেতু উপরে বর্ণিত ঈমান ভঙ্গের মূলনীতিসমূহের আলোকে যে কোনো কুফরী মতবাদকে চিহ্নিত করা সম্ভব। ইনশা-আল্লাহ।

ইসলামে গনতন্ত্র এর বিধান ইসলামে গনতন্ত্র এর বিধান ইসলামে গনতন্ত্র এর বিধান

Leave a Reply

Your email address will not be published.