আল্লাহর আইন অমান্য কারীর বিধান

আল্লাহর আইন অমান্য কারীর বিধান শায়েখ আব্দুল্লাহ আল-মূনীর এর প্রবন্ধটি পড়া শেষ হলে শেয়ার করতে ভূলবেন না।

এ বিষয়ে উম্মতে মুসলিমার ইজমা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, আল্লাহ তায়ালা আমাদের উপর যা কিছু ফরজ করেছেন তা আবশ্যকভাবে পালন করতে হবে এবং তিনি যা কিছু নিষিদ্ধ করেছেন বর্জন করতে হবে। যারা আল্লাহর আদেশ অমান্য করে এবং নিষিদ্ধ কাজে লিপ্ত হয় তারা অপরাধী ও পাপী হিসেবে গণ্য হবে। তবে এই প্রকারের অবাধ্যতার কারণে তারা কাফিরে পরিনত হবে না। পাপী ব্যক্তিদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হলো তারা কাফিরদের মতো চিরকাল জাহান্নামে অবস্থান করবে না বরং হয়তো আল্লাহ্ তায়ালা তাদের কিয়ামতের ময়দানে ক্ষমা করবেন এবং অন্যান্য মুমিনদের সাথে জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি দেবেন অথবা পাপে লিপ্ত হওয়ার কারণে তাদের কিছুকাল জাহান্নামে রাখার পর পুনরায় জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। এটা নিশ্চিত বিশ্বাস রাখতে হবে যে, আল্লাহর আদেশ অমান্য করলেই কেউ কাফিরে পরিনত হয় না এবং এধরনের পাপী ব্যক্তিরা কাফির-মুশরিকদের মতো চিরকাল জাহান্নামে অবস্থান করবে না। আল্লাহ তায়ালা বলেন,

নিশ্চয় আল্লাহ তার সাথে শিরক করার অপরাধ ক্ষমা করেন না। এ ছাড়া অন্য যে কোন অপরাধ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করে থাকেন। (সুরা নিসা-৪৮)

যে কেউ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্ বলে এবং তার উপর মৃত্যুবরণ করে তবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।

আবু জর রাঃ বললেন, “যদিও সে জিনা করে বা চুরি করে?” রসুলুল্লাহ সাঃ বললেন, হ্যা, যদি সে জিনা করে ও চুরি করে।(বুখারী ও মুসলিম)

একজন ব্যক্তি প্রায়ই মদ পান করতো আর তাকে একারণে বারবার শাস্তি প্রদান করা হতো। একদিন অন্য একজন সাহাবী বললেন, এর উপর আল্লাহর অভিসাপ, একে মদ পান করার অপরাধে কত বার পাকড়াও করা হলো আর কত বার শাস্তি প্রদান করা হলো! রসুলুল্লাহ সাঃ বললেন, তোমরা তাকে অভিসাপ দিয়ো না আমার জানামতে সে আল্লাহ্ ও তার রসুলকে ভালবাসে। (সহীহ বুখারী)

এই হাদীস প্রমান করে, নিয়মিত মদ পান করে এমন একজন ব্যক্তির অন্তরেও আল্লাহ ও তার রসুলের প্রতি ভালবাসা ও ইমান বিদ্যমান থাকতে পারে।

তবে এমন বেশ কিছু হাদীস রয়েছে যেখানে বিভিন্ন পাপ কাজকে কুফরী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। রসুলুল্লাহ সাঃ বলেন, যে জিনা করে সে জিনা করার সময় মুমিন থাকে না। যে মদ পান করে সে মদ পান করার সময় মুমিন থাকে না। যে চুরি করে সে চুরি করার সময় মুমিন থাকে না। (বুখারী ও মুসলিম)

এছাড়া অন্যান্য হাদীসে মৃতের জন্য বিলাপ করে কাঁদা, কারো বংশ তুলে গালি দেওয়া, নিজের পিতার পরিবর্তে অন্য কাউকে পিতা বলে পরিচয় দেওয়া, মনিবের নিকট হতে দাসের পলায়ন করা, স্ত্রীর পক্ষ থেকে স্বামীকে নিন্দা করা ইত্যাদি কর্মকান্ডকে কুফরী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

হাদীসের ব্যাখ্যাকররা এসব হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেছেন এখানে মূলত কঠোরতা প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে এমনটি বলা হয়েছে প্রকৃত অর্থেই কুফরী বোঝানোর জন্য নয়। বিভিন্ন হাদীসের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে তারা এই মত পোষণ করেছেন।

ইমাম নাব্বী রঃ শারহে মুসলিমে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা উপস্থাপণ করেছেন। তিনি যা বলেছেন তার সারাংশ হলো, আহলুসসুন্নাহ ওয়াল জামায়ার সকল ওলামায়ে কিরামের ইজমা এর উপর যে, পাপী ব্যক্তি চিরস্থায়ী জাহান্নামী হবে না। সে আদৌ জাহান্নামে প্রবেশ করবে কি না সেটাও নিশ্চিত নয়। তার বিষয়টি আল্লাহর ইচ্ছাধীন। যদি তাকে প্রথমেই ক্ষমা করে দেন তবে সে জাহান্নামে প্রবেশ করান তবে সে সেখানে স্থায়ী হবে না বরং একটি নির্দিষ্ট সময় পর তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে।

এটিই দলিল প্রমানের আলোকে স্পষ্ট প্রমাণিত ও ওলামায়ে কিরামের নিকট সর্বসম্মতিক্রমে গৃহিত সিদ্ধান্ত। যারা এর বিপরীত মত পোষণ করে এবং কবীরা গোনাহে লিপ্ত ব্যক্তিকে কাফির হিসেবে আখ্যায়িত করে তাদের বলা হয় খারেজি। সাহাবায়ে কিরামের যুগ থেকেই এই শ্রেণীর লোক বিদ্যামান ছিল। সকল সাহাবায়ে কিরাম ও তাদের পরবার্তী ওলামায়ে কিরাম এ বিষয়ে ঐক্যমত পোষণ করেছেন যে, খারেজীরা স্পষ্ট ভ্রান্ত ও বিদয়াতী কেউ কেউ তাদের কাফিরও বলেছেন। সকলেই তাদের মত বর্জন করেছেন এবং সেটা খন্ডায়ন করেছেন।

সুতরাং আল্লাহর আদেশ অমান্য করার কারণে কোনো মুসলিমকে কাফির বলা যাবে না। এ বিষয়টি জেনে নেওয়ার পর লক্ষ্যনীয় বিষয় হলো, আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনের স্পষ্ট আয়াতের মাধ্যমে বা রসুলের বাণীর মাধ্যমে যেসব বিধি-বিধান ও আইন-কানুন প্রনয়ন করেছেন এবং সেগুলোর মাধ্যমে বিচার-ফয়সালা করতে আদেশ করেছেন সেগুলোর অবাধ্য হওয়া কবীরা গোনাহ্ বলে গণ্য হবে তবে কুফরী হবে না। যেহেতু আল্লাহর আদেশ অমান্য করা বা তার অবাধ্য হওয়া কুফরী নয়। তবে কেউ আল্লাহর বিধানকে অস্বীকার বা অপছন্দ করলে তাকে কাফির বলা বলা হবে কারণ আল্লাহর বিধানকে অস্বীকার করা বা অপছন্দ করা কুফরী। আল্লাহর বিধানের পরিবর্তে অন্য কোনো বিধানকে সত্য ও সঠিক বলে মনে করাও কুফরী। আল্লাহ তায়ালা বলেন,

যে কেউ আল্লাহর আইন দিয়ে বিচার করে না সে কাফির। (সুরা মায়েদা-৪৪)

ইবনুল আরাবী আল-মালেকী রঃ তার আহকামুল কুরআনে এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, এ বিষয়টি বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। যদি সে নিজের তৈরী বিধানকে আল্লাহর বিধান বলে দাবী করে তবে এটা শরীয়ত পরিবর্তন করা বলে গণ্য হবে এবং কুফরী হবে আর যদি সে অবাধ্যতাবশত খেয়ালখুশি মতো বিচার ফয়সালা করে (কিন্তু এটাকে আল্লাহর পক্ষ থকে বলে দাবী না করে) তবে সে পাপী হিসেবে গণ্য হবে (কাফির হিসেবে নয়) । অতএব, আহ্লুস্সুন্নাহ ওয়াল জামায়ার মূলনীতি অনুযায়ী তার এ অপরাধ (আল্লাহ ইচ্ছা করলে) ক্ষমা হতে পারে।

অন্য একটি আয়াতে আল্লাহ বলেন,

তারা তাদের পন্ডিতবর্গ ও সন্যাসীদের আল্লাহর পরিবর্তে রব হিসেবে গ্রহণ করেছে। (সুরা তাওবা-৩১)

এ আয়াত প্রসঙ্গে ইবনে তাইমিয়া রঃ বলেন, এরা নিজেদের সন্যাসী ও পন্ডিতবর্গকে রব হিসেবে গ্রহণ করেছিল যেহেতু আল্লাহ যা হারাম করেছেন তা হালাল করা এবং আল্লাহ যা হালাল করেছেন তা হারাম করার ব্যাপারে তারা তাদের আনুগত্য করেছিল। বিষয়টি দুরকম হতে পারে।

এরপর তিনি উভয় প্রকারের বিস্তারিত বর্ণনা উল্লেখ করেছেন। প্রথম প্রকারের বর্ণনায় তিনি বলেন, ঐ সকল লোকেরা (সন্যাসী ও পন্ডিতবর্গ) আল্লাহর বিধানের পরিবর্তে ভিন্ন একটি বিধান গ্রহণ করেছে এটা জানা সত্বেও তাদের বিধানটিকেই (সত্য হিসেবে) গ্রহণ করে। নেতৃস্থানীয়দের কথা অনুযায়ী আল্লাহ যা হারাম করেছেন সেটাকে হালাল এবং তিনি যা হালাল করেছেন সেটাকে হারাম বলে আক্বীদা রাখে। অথচ সে জানে যে, আল্লাহর বিধান এর বিপরীত। তবে এটা কুফরী হবে।

দ্বিতীয় প্রকার সম্পর্কে ইবনে তাইমিয়া রঃ বলেন, আর যদি এমন হয় যে, তারা আক্বীদা-বিশ্বাসে হালালকে হালালই মনে করে এবং হারামকে হারামই মনে করে তবে ঐ সকল সন্যাসী ও পন্ডিতর্বকে অনুসরণ করে আল্লাহর আদেশ অমান্য করে। যেমনটি একজন মুসলিম বিভিন্ন প্রকারে আল্লাহর অবাধ্য হয়ে থাকে তবে সে এটা বিশ্বাস করে যে আসলে সে পাপ করছে। এদের বিধান হবে অন্যান্য পাপীদের মতই। (অর্থাৎ তারা কাফির হবে না) {মাজমুয়ায়ে ফাতাওয়া}

ইবনে তাইমিয়ার কথার মাধ্যমে স্পষ্টভাবে যে বিষয়টি প্রমাণিত হয় তা হলো, আল্লাহর বিধান পরিত্যাগ করা এবং অন্য কারো বিধান গ্রহণ করা দু রকম হতে পারে। যদি কেউ অন্তরের আক্বীদা বিশ্বাসেও বাতিল বিধানকে সঠিক মনে করে তাহলে সে কাফিরে পরিনত হবে। তবে সে ক্ষেত্রে শর্ত হলো তাকে জানতে হবে যে, মুলত এই বিধানটি আল্লাহর বিধানের বিপরীত। আর যদি সে অন্তরে আল্লাহর বিধানকেই সঠিক মনে করে কিন্তু বাহ্যিকভাবে অন্য কোনো বিধান অনুসরণ করে তবে সেটা কুফরী নয় বরং সাধারন অপরাধ হিসেবে গন্য হবে যা ক্ষমার অযোগ্য নয়।

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

তারা কি জাহিলিয়্যাতের বিধান চায়ঃ যারা নিশ্চিত বিশ্বাস করে তাদের জন্যে আল্লাহর চেয়ে উত্তম বিধান দাতা আর কে আছে? (সুরা মায়েদা-৫০)

ইবনে কাছির রঃ এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, জাহেলী বিধান সমুহের মধ্যে ঐসব বিধানও গন্য তাতাররা যার মাধ্যমে রাজনৈতিক বিষয়াদির ফয়সালা করতো যা তারা তাদের নেতা চেঙ্গিস খান হতে গ্রহন করেছিল যে তাদের জন্য ইয়াসাক নামে একটি সংবিধান রচনা করে দিয়েছিল যা সে ইয়াহুদী, খৃষ্টান ও ইসলাম ধর্মের বিধিবিধান হতে কিছু কিছু গ্রহণ করার মাধ্যমে রচনা করেছিল। তাতে এমন কিছু বিষয়ও ছিল যা তার নিজের মত। পরে এটাই তার বংশধরদের মধ্যে অনুসরণীয় বিধানে পরিনত হয়। তারা আল্লাহ ও তার রসুলের বিধানকে পিছনে ঠেলে উক্ত বিধানের মাধ্যমে বিচার করতো। তাদের মধ্যে যে কেউই এমনটি করবে সে কাফির হবে তার সাথে জিহাদ করা ফরজ হবে যতক্ষন না সে আল্লাহর বিধান ও তার রসুলের বিধানের দিকে ফিরে আসে। (তাফসীরে ইবনে কাছীর)

অন্য স্থানে তিনি অতিরিক্ত বলেন, যে কেউ এমন করবে সকল মুসলিমের ঐক্যমতে সে কাফিরে পরিনত হবে। (বিদাইয়া ওয়ান নিহাইয়া)

ইবনে কাছির রঃ তাতারদের এই কর্মকান্ডকে কুফরী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন কারণ তারা ইসলামের পাশাপাশি ইয়াহুদী ও খৃষ্টান ধর্মকেও সঠিক বলে মনে করতো (ইবনে তাইমিয়া রঃ বলেন, একইভাবে তাতারদের মধ্যকার নেতৃত্বস্থানীয়রা এবং অন্যান্যরা ইসলামকে ইয়াহুদী ও খৃষ্টানদের ধর্মের অনুরুপ মনে করতো। তারা বলতো এগুলো আল্লাহর নিকট পৌছানোর বিভিন্ন পন্থা যেমন মুসলমানদের চারটি মাজহাবের মতো। এই তিনটি ধর্মকে সঠিক হিসেবে মেনে নেওয়ার পর তাদের মধ্যে কেউ কেউ ইয়াহুদী বা খৃষ্টান ধর্ম বেশি উত্তম মনে করে সেটা গ্রহণ করতো আবার কেউ কেউ ইসলামকে বেশি উত্তম মনে করে তাতে প্রবেশ করতো। (মাজমুয়ায়ে ফাতাওয়া)

এবং চেঙ্গিস খানকে আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন বার্তাবাহক হিসেবে গণ্য করতো। (ইবনে তাইমিয়া রঃ বলেন, তাতাররা চেঙ্গিস খানকে অত্যাধিক সম্মনিত মনে করতো। তারা বিশ্বাস করতো সে আল্লাহর পূত্র খৃষ্টানরা ইসা এর ব্যাপারে যেমনটি করে থাকে। তিনি আরো বলেন, তাতাররা মুসলিম হওয়ার পর তাদের পক্ষ থেকে একজন দূত শামের মুসলিমদের নিকট এসে নিজেদের মুসলিম প্রমাণের চেষ্টা করে। সে বলে, এই দুটি কথা মুহাম্মাদ ও চেঙ্গিস খান আল্লাহর নিকট হতে নিয়ে এসেছেন। অর্থাৎ তারা চেঙ্গিস খানকে আল্লাহর নবীর সমান মনে করতো)। মূলত একারণেই তারা ইয়াহুদী ও খৃষ্টান ধর্ম হতে কিছু বিধান গ্রহণ করেছিল এবং চেঙ্গিস খান যেসব বিধি-বিধান প্রণয়ন করেছিল সেগুলো অনুসরণ করতো। অর্থাৎ তারা ইয়াসেখ নামক সংবিধানে উল্লেখিত বিধি-বিধান সমূহ আল্লাহর পক্ষ থেকে এটাই মনে করতো বা কমপক্ষে এগুলোকে সঠিক হিসেবে দাবী করতো। একারণে ইবনে কাছির রঃ দ্ব্যার্থহীনভাবে তাদের কাফির হিসেবে ঘোষণা করেছেন। কেবলমাত্র কিছু নিষিদ্ধ আইন-কানুন গ্রন্থকারে লিপিবদ্ধ করা বা রাষ্ট্রে চালু করার কারণে নয়।

আল্লাহর আইন অমান্য কারীর বিধান শায়েখ আব্দুল্লাহ আল-মুনীর এর প্রবন্ধটি পড়া শেষ হলে আপনার বন্ধুদের মাঝে শেয়ার করুন। এবং আল্লাহর আইন অমান্য কারীর বিধান প্রবন্ধটি পড়ে আপনার মতামত ব্যক্ত করুন। একই সাথে আল্লাহর আইন অমান্য কারীর বিধান প্রবন্ধটি ব্যবহারিক জীবনে প্রয়োগ করুন।

One thought on “আল্লাহর আইন অমান্য কারীর বিধান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *