সলাত ত্যাগকারীর বিধান

সলাত ত্যাগকারীর বিধান শায়েখ আব্দুল্লাহ আল মুনির এর গবেষনা মুলক প্রবন্ধটি পড়া শেষ হলে আপনার বন্ধুদের মাঝে শেয়ার করুন।

এই প্রকৃতির আরেকটি মাসয়ালা হলো, সলাত ত্যাগকারীকে কাফির বলা। যখন ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম ছিল, রাষ্ট্রীয়ভাবে সলাত কায়েম করা হতো। ছোট বড় সকলে পড়তে অভ্যস্ত ছিল। সলাত ত্যাগকারীকে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে বিভিন্নরকম লাঞ্চনা-গঞ্জনা ও শাস্তির সম্মুখীন হতে হতো। এমনকি ক্ষেত্র বিশেষে সলাত ত্যাগকারীকে হত্যা করার বিধান ছিল। সেই অবস্থায় সলাত পরিত্যাগ করা অর্থ আল্লাহর দ্বীনকে বৃদ্ধঙ্গুলী প্রদর্শন করা এমন মনে করে তৎসময়ের কিছু কিছু ওলামায়ে দ্বীন সালাত পরিত্যাগ কারীকে কাফের হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। বিশেষ করে যে ব্যক্তিকে সলাত ত্যাগ করার অপরাধে পাকড়াও করা হয় এবং বারবার সতর্ক করে বল হয় তুমি সলাত না পড়লে তোমাকে হত্যা করা হবে তবু সে সলাত পরিত্যাগ করার ব্যাপারে অনড় থাকে এবং নিহত হয় এই ব্যক্তি সম্পর্কে তারা বলেন যদি তার অন্তরে আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সামান্যতম শ্রদ্ধাবোধ থাকতো তবে হত্যার মোকাবেলায় সালাত পরিত্যাগ করার ব্যাপারে জিদ ধরতো না। তারা এই ব্যাক্তিকে কাফির বলেছেন। এটি ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল এর একটি মত এবং তার মাজহাবের একদল আলেমের মত তবে আহমাদ ইবনে হাম্মল হতে অন্য আরেকটি বর্ণনা এবং হাম্বালী মাজহাবের অন্য আরেক দল ওলামায়ে কিরাম সহ অন্যান্য সকল ওলামায়ে কিরামের মতে অন্যান্য মাসয়ালার মতো এ বিষয়টিও কুফরী নয়। তারা সলাত ত্যাগকারীকে কাফির বলেন নি যতক্ষণ না সে সলাতের ফারজিয়্যাত অস্বীকার করে বা অন্য কোনো পন্থায় স্পষ্টভাবে আল্লাহর দ্বীনের প্রতি অবজ্ঞা ও অশ্রোদ্ধা প্রদর্শন করে। কোনো ব্যাখ্যামূলক কথা ও কাজের মাধ্যমে আল্লাহর দ্বীনের প্রতি অবজ্ঞা ও অশ্রোদ্ধা প্রদর্শন করে। কোনো ব্যাখ্যামূলক কথা ও কাজের মাধ্যমে আল্লাহর দ্বীনকে অবমাননা ও অশ্রোদ্ধা করা হচ্ছে এমন ধরে নিয়ে তারা কাউকে কাফির বলেন নি।

ইমাম নাব্বী রঃ এ বিষয়ে ওলামায়ে কিরামের মতামত সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে বলেন,

যদি সলাত ত্যাগ কারী সলাতের ফরজিয়াত অস্বীকার করে তবে সে কাফির এবং ইসলাম হতে বহির্ভূত। এ ব্যাপারে মুসলিমদের ইজমা সম্পাদিত হয়েছে। তবে যদি সে নও মুসলিম হয় এবং এমন হয় যে সে মুসলিমদের সাথে এতটুকু সময় মেলামেশা করতে পারেনি যাতে তার নিকট সলাত ফরজ হওয়ার বিষয়টি পৌছায় (তাহলে সে কাফির হবে না)। আর যদি কেউ অলসতা করে সলাত ত্যাগ করে যেমনটি বর্তমানে বহু সংখ্যক লোক করে থাকে তবে তার ব্যাপারে আলেমরা ইখতিলাফ করেছেন। ইমাম মালিক, ইমাম শাফেঈ এবং পূর্বের ও পরের বেশিরভাগ আলেম বলেছেন সে কাফির হবে না বরং ফাসিক হবে তাকে আমরা তওবা করতে বলবো। যদি সে তওবা করে তবে ভাল তওবা না করলে আমরা তাকে হদ হিসাবে হত্যা করবো যেমন হত্যা করা হয় বিবাহিত জেনাকারীকে (অর্থাৎ মুসলিম হওয়া সত্বেও তাকে হত্যা করা হয়) তবে তাকে হত্যা করা হবে তরবারী দিয়ে। পুর্বর্তীদের কেউ কেউ বলেছেন তাকে কাফির বলা হবে এটা আলী রাঃ এর মত। ইমাম আহমদের দুটি মতের এটি একটি আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক, ইসহাক ইবনে রহাওয়াই এবং শাফেঈ মাযহাবের কারো কারো এই মত। আবু হানীফা, কুফার একদল আলেম এবং শাফেঈ মাযহাবের আল মুযনী বলেছেন তাকে কাফিরও বলা হবে না হত্যাও করা হবে না। তাকে তাজীর হিসাবে শাস্তি দেওয়া হবে এবং আটকিয়ে রাখা হবে যতক্ষন না সে সলাত আদায় করে। (শারহে মুসলিম)

এখানে লক্ষ্যনীয় বিষয় হলো, সলাত ত্যাগকারীকে যারা কাফির বলেছেন তারা যে পরিবেশ ও পরিস্থিতিতে সলাত ত্যাগ করা কুফরী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন প্রকৃতপক্ষেই সে অবস্থাতে সলাত ত্যাগ করা কুফরী হওয়ার সম্ভাবনা ছিল বলেই তারা তা বলেছেন। যেহেতু রাষ্ট্রীয়ভাবে ও সামাজিকভাবে সলাত কায়েম রয়েছে এমন একটি পরিবেশে নানাবিধ লাঞ্চনা-গঞ্জনা সহ্য করে এবং হত্যা, জেল-জরিমানা ইত্যাদি বিভিন্ন প্রকার শাস্তির সম্ভাবনা উপেক্ষা করে যারা সলাত পরিত্যাগ  করতে থাকে তারা যে আসলে দ্বীনকে অশ্রোদ্ধা ও অসম্মান করে এমন আশঙ্কা করা অযৌক্তিক বলা যেতে পারে না। বিশেষত যাকে সলাত পরিত্যাগ করার অপরাধে হত্যা করা হয় তবু সে সলাত আদায় করে না তার ব্যাপারে এই আশঙ্কা আরও তীব্র। এ কারণেই পূর্ববর্তী ওলামায়ে কিরামের একটি অংশ তাদের সমসাময়িক পরিবেশ ও পরিস্থিতিতে সলাত ত্যাগকারীকে কাফির হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। কিন্তু সেই অবস্থাতেও বেশিরভাগ ওলামায়ে কিরাম এ বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করেছেন। যেহেতু তারা এ বিষয়টিতে নিশ্চিতভাবে ইসলামকে অশ্রোদ্ধা ও অসম্মান করা হচ্ছে এমন মনে কনে নি। বরং অন্তরে ইসলামের প্রতি ভালবাসা ও শ্রদ্ধা থাকা সত্ত্বেও প্রবৃত্তির বশবর্তী হয়ে এমন পাপে লিপ্ত হওয়া সম্ভব বলে তারা মনে করেছেন। একারণে তারা ঐ অবস্থাতেও সলাত ত্যাগকারীকে কাফির বলেন নি।

এই হচ্ছে ওলামায়ে কিরামের মতামত। কিন্তু তাদের ব্যাপারে অবাক না হয়ে পারি না যারা এমন পরিবেশ ও পরিস্থিতে সলাত ত্যাগকারীকে কাফির হিসেবে আখ্যায়িত করছে যে পরিবেশে সলাত রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। এখানে সলাত ত্যাগ করার কারণে নয় বরং সলাত পড়া বা মুখে দাড়ি রাখার কারণে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে লাঞ্চিত ও বঞ্চিত হতে হয়। যার অন্তরে দ্বীনের প্রতি অকৃত্রিম ভালবাসা ও সীমাহীন দরুদ উপস্থিত আছে তার পক্ষেও ইচ্ছা ও অনুভুতি থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন শয়তানী ষড়যন্ত্রের ভয়াল থাবা হতে মুক্ত হয়ে পাঁচ ওয়াক্ত সলাতে অভ্যস্ত হওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না। সলাত সম্পর্কে উপদেশ দেওয়া হলে তাদের অন্তর বিগলিত হয় ক্ষেত্রবিশেষে দু-চোখ  অশ্রুশিক্ত হয়। সলাত পড়ানোর জন্য এদের হত্যার ভয় দেখানোর প্রয়োজন নেই বরং তাদের অন্তর সালাতের দিকে ঝুঁকেই রয়েছে কেবল একটু সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি হলেই তারা সলাতে অভ্যস্ত হয়ে পড়তো। একারণে দেখা যায় রমজান মাস, শবে কদর ইত্যাদি বিভিন্ন উপলক্ষে তারা কাতারে কাতারে মসজিদে হাজির হয়। যারা এই প্রকৃতির লোকদের কাফির বলে তারা এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট ভ্রান্তিতে লিপ্ত।

ওলামায়ে কিরামে মতামতের আলোকে আমরা তাদের এই ভ্রান্তি সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরবো ইনশা-আল্লাহ। যারা সলাত ত্যাগকারীকে কাফির বলে তারা নিজেদের স্বপক্ষে বেশ কিছু দলিল-প্রমাণ উত্থাপন করে থাকে। তার মধ্যে সর্বাধিক স্পষ্ট ও উল্লেখেযোগ্য হলো রাসুলুল্লাহ্ সাঃ এর ঐ সকল হাদীস যাতে সলাত ত্যাগ করা কুফরী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এ অর্থের বিভিন্ন হাদীস বর্ণিত আছে। যেমন,

কুফর শিরকের সাথে কোনো মুসলিমের পার্থক্য হলো সলাত। (সহীহ্ মুসলিম)

অন্য হাদীসে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, যে বিষয়টির মাধ্যমে মুসলিম ও কাফিরের পার্থক্য বোঝা যায় তা হচ্ছে সলাত অতএব যে কেউ সলাত পরিত্যাগ করে সে কুফরী করে। (তিরমিযী) (ইমাম তিরমিযী বলেছেন হাদীসটি হাসান সহীহ ও গরীব। ইমাম আজ-জাহাবী কিতাবুল কাবাইর-এ হাদিসটিকে সহীহ বলে আখ্যায়িত করেছেন। শায়েখ আলবানী হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন।){মিশকাত-৫৭৪}

শাকীক আল-উকাইলী বর্ণনা করেন,

রাসুলুল্লাহ্ সাঃ এর সাহাবায়ে কিরাম কোনো আমল পরিত্যাগ করা কুফরী মনে করতেন না কেবল সলাত ছাড়া(তিরমিযী){শায়েখ আলবানী হাদীসটিকে সহীহ্ বলেছেন}(মিশকাত-৫৭৯)

এই সকল দলিল প্রমাণের আলোকে সলাত পরিত্যাগকারীকে কাফির বলা হয়। এ বিষয়ে জমহুর ওলামায়ে কিরামের বক্তব্য হলো, এই সকল হাদীস এবং এই অর্থের অন্যান্য হাদীসসমূহ যাতে বিভিন্ন আমলকে কুফরী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে সেখানে কুফরী শব্দটি প্রকৃত কুফরী তথা আল্লাহর দ্বীন থেকে বের হয়ে কাফির হয়ে যাওয়া বোঝানো হয়নি বরং এখানে কুফরী শব্দটি ‘তাগলীজ’ বা অধিক কঠোরতা অর্থে ব্যাবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ সলাত ত্যাগকারীর অপরাধ এতটাই ভয়াবহ যে তা কুফরীর সাথে তুলনীয়। এধরণের কঠোরতা মূলক হাদীস কেবল সলাত ত্যাগ করা সম্পর্কে নয় বরং বিভিন্ন বিষয়ে এসেছে। যেমন, যে কেউ নিজের বাবা ছাড়া অন্যকে বাবা বলে পরিচয় দেয় সে কাফির হয়ে যায়। (সহীহ্ মুসলিম)

মসলিমে বর্ণিত আরেকটি রেওয়ায়েতে এসেছে, “তার জন্য জান্নাত হারাম হয়ে যায়”। রসুলুল্লাহ সাঃ আরো বলেন, মানুষের মধ্যে দুটি কুফরী বিদ্যামান রয়েছে বংশ তুলে গালি দেওয়া এবং মৃতের জন্য বিলাপ করে কাঁদা। (সহীহ্ মুসলিম)

যে ব্যক্তি আত্মহত্যা করে তার সম্পর্কে অন্য হাদীসে বলা হয়েছে, যদি কেউ নিজেকে কোনো লৌহ খন্ড দ্বারা আঘাত করে তবে সেই খন্ডটি তার হাতে থাকবে সে ওটি দ্বারা জাহান্নামের মধ্যে চিরকাল চিরস্থায়ীভাবে নিজের পেটে আঘাত করতে থাকবে। (বুখারী ও মুসলিম)

এই সকল হাদীসের ব্যাপারে সকল ওলামায়ে কিরামের ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, এগুলোর প্রকাশ্য অর্থ উদ্দেশ্য নয়। বরং বিভিন্ন পাপকাজের অধিক ভয়াবহতা প্রকাশ করার জন্য সেগুলোকে কুফরীর সাথে তুলনা করা হয়েছে। এখানে প্রকৃত কুফরী উদ্দেশ্য নয়। জমহুর ওলামায়ে কিরাম সলাত ত্যাগকারীকে কাফির বলা সংক্রান্ত হাদীস সমূহের একই ব্যাখ্যা করে থাকেন।

যে রেওয়ায়েতে বর্ণিত আছে, সাহাবায়ে কিরাম অন্য কোনো আমল পরিত্যাগ করা কুফরী হিসেবে গণ্য করতেন না সলাত ছাড়া সেটাও একই অর্থে। অর্থাৎ তারা সলাত ত্যাগ করা এবং সলাত ত্যাগকারীর ব্যাপারে অত্যাধিক কঠোরতা করতেন যা অন্য কোনো আমলের ব্যাপারে করতেন না। তারা সলাত ত্যাগ করা প্রকৃত অর্থেই কুফরী মনে করতেন এমন নয়। যদি এই রেওয়াতটিতে কুফরী অর্থ প্রকৃত কুফরী ধরে নেওয়া হয় তবে তার অর্থ হবে সমস্ত সাহাবায়ে কিরামের ঐক্যমতে বা কমপক্ষে তাদের মধ্যে বেশিরভাগের মতে সলাত পরিত্যাগ করা প্রকৃত অর্থেই কুফরী যা একজন ব্যাক্তিকে ইসলাম থেকে বের করে দেয়। সুতরাং এ বিষয়ে সাহাবায়ে কিরামের ঐক্যমত প্রমাণিত হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কোনো একটি বিষয়ে সাহাবায়ে কিরামের ঐক্যমত বা বেশিরভাগ সাহাবায়ে কিরামের মত পরিত্যাগ করে পরবর্তী ওলামায়ে কিরামের বেশিরভাগ অংশ (তিন মাযহাবের সকল ওলামায়ে কিরাম এবং হাম্বালী মাযহাবের আলেমদের একটি বিরাট অংশ) কিভাবে সলাত পরিত্যাগকারী কাফির নয় এমন ফতোয়া দিতে পারেন! এটাই প্রমাণ করে যে, সাহাবায়ে কিরাম প্রকৃত কুফরী অর্থে নয় বরং অধিক কঠোরতা প্রদর্শনের জন্য সলাত ত্যাগ করাকে কুফরী হিসেবে আখ্যায়িত করতেন। তাদের উদ্দেশ্য অনুধাবন করতে সক্ষম হওয়ার কারণে তাদের নিকটবর্তী যুগের ওলামায়ে দ্বীন পরবর্তীতে সলাত ত্যাগ করা প্রকৃত অর্থে কুফরী নয় এই মত দিয়েছেন। সাহাবায়ে কিরাম থেকে এ ধরণের কঠোরতা বিভিন্ন ব্যাপারে বর্ণিত আছে, ইবনে কাছীর রঃ তার তাফসীরে বর্ণনা করেন, উমর রাঃ বলেন, যে কেউ হজ্জ করার সামর্থ রাখে তবে হজ্জ করে না সে ইয়াহুদী হয়ে মারা যাক বা খৃষ্টান হয়ে মারা যাক তাতে কোনো যায় আসে না।

ইবনে কাছির বলেন, “উমর রাঃ হতে এটি সহীহ সনদে বর্ণিত হয়েছে”। এরপর তিনি উমর রাঃ হতে আরেকটি বর্ণনা উল্লেখ করেছেন যে তিনি বলেছেন, আমার তো ইচ্ছা হয়, কিছু লোককে বিভিন্ন এলাকাতে প্রেরণ করি তারা দেখবে কে সামর্থ থাকা সত্ত্বেও হজ্জ করে নি। তাদের উপর জিজিয়া আরোপ করা হবে। ওরা মুসলিম নয়, ওরা মুসলিম নয়।

এই রেওয়ায়েতটি দুর্বল। তবে পূর্বের বর্ণনাটির সাথে এর সাদৃশ্য রয়েছে। যেহেতু সেখানে হজ্জ পরিত্যাগ কারীকে ইয়াহীদী খৃষ্টানদের সাথে তুলনা করা হয়েছে। এই সকল বর্ণনার উদ্দেশ্য অধিক কঠোরতা প্রদর্শন করা। প্রকৃত অর্থেই অমুসলিম ঘোষণা করা নয়। ইমাম মালিক রঃ আরেকটি বর্ণনা উল্লেখ করেছেন। যেসব মুজাহিদরা যুদ্ধের সময় পাহাড়ে আশ্রয় নেওয়া কাফিরদের বলে, ভয় নেই, বের হয়ে এসো। কিন্তু বের হয়ে আসলে তাদের হত্যা করে তাদের তিরস্কার করে উমর রাঃ বলেন, আল্লাহর কসম করে বলছি যদি কাউকে এমন করতে শুনি তবে তাকে আমি হত্যা করবো। (মুয়াত্তা মালিক)

এই রেওয়ায়েতটি উল্লেখের পর ইমাম মালিক নিজেই বলেছেন, “এর উপর আমল নেই” ইমাম মালিকের একথা বলার কারণ রাসুলুল্লাহ সাঃ বলেন, “কোনো মুসলিমকে কাফিরের বিনিময়ে হত্যা করা হবে না”। মুস্তামান তথা যাকে নিরাপত্তা দেওয়া হয় এমন কাফিরের ক্ষেত্রে সকল ওলামায়ে কিরাম ঐক্যমত পোষণ করেছেন যে, তাকে হত্যা করা অপরাধ হলেও তার বিনিময়ে কোনো মসলিমকে হত্যা করা হবে না। এই পরিপ্রেক্ষিতে উমর রাঃ এর উপর উপরোক্ত কথাটি আসলে ভীতিপ্রদর্শনের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে প্রকৃতই হত্যা করা হবে এমন নয় এটিই বিজ্ঞ ওলামায়ে কিরামের মত। হাসান বছরী রঃ থেকে বর্ণিত আছে, আমি এমন কিছু লোকের সাক্ষাত পেয়েছি তোমরা তাদের দেখলে বলতে পাগল আর তারা তোমাদের দেখলে বলতো শয়তান। (মিজানুল আমাল)

এখানে তিনি সাহাবায়ে কিরামের উদ্দেশ্য করছেন। এটা সাহাবায়ে কিরামের দুনিয়া বিমুখিতা ও পাপ কাজকে তিরস্কার করার ব্যাপারে অত্যাধিক কঠোরতার দৃষ্টান্ত স্বরুপ বলা হয়েছে। প্রকৃত অর্থেই তারা হাসান বছরীর সময়কার সকল লোককে দেখামাত্র শয়তান বলে আখ্যায়িত করতেন এমন নয়।

মোট কথা, সলাত ত্যাগকারী কাফির হওয়ার ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ সাঃ এর হাদীসে বা সাহাবায়ে কিরামের আছারে যা কিছু বলা হয়েছে জমহুর ওলামায়ে কিরাম সেগুলোর প্রকৃত অর্থ গ্রহণ করেন নি। যেহেতু অন্যান্য বিভিন্ন পাপ কাজের ব্যাপারে একই রকম শব্দ প্রয়োগ করা হয়েছে আর পাপ কাজে লিপ্ত হওয়া কুফরী নয় এ ব্যাপারে আহলুস সুন্নাহ্ ওয়াল জামায়াতের সকল ওলামায়ে কিরামের ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাছাড়া সলাত ত্যাগ কারী কাফির না হওয়ার স্বপক্ষে আরো স্পষ্ট দলিল রয়েছে। সেমন, রাসুলুল্লাহ সাঃ এর হাদীস,

পাঁচ ওয়াক্ত সলাত আল্লাহ বান্দার উপর ফরজ করেছেন যে এগুলো আদায় করে এবং এর মধ্যে কোনো ত্রুটি করে না, এর হক নষ্ট করে না তবে আল্লাহর নিকট তার জন্য এই ওয়াদা রয়েছে যে তিনি তাকে ক্ষমা করবেন আর যে এগুলো আদায় করে না আল্লাহর নিকট তার জন্য কোনো ওয়াদা নেই। আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাকে শাস্তি দেবেন ইচ্ছা করলে জান্নাতে দেবেন। (আবু দাউদ, মুয়াত্তা মারিক){ইবনে আব্দিল বার বলেন, এই হাদীসটি প্রমাণিত ও বিশুদ্ধ। ইবনে হাযার আসক্বলানী রঃ ইবনে আব্দিল বার এর এই মত উল্লেখ করেছেন। (তালখীস)। শায়েখ আলবানী হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন। (সহীহু আবি দাউদ-১২৭৬)}

হাম্বালী মাযহাবের প্রখ্যাত ফকীহ্ ইবনে কুদামা রঃ এই হাদীসটি সলাত ত্যাগকারী কাফির না হওয়ার স্বপক্ষে ব্যবহার করেছেন।

তিনি বলেন,

যদি সলাত ত্যাগ কারী কাফিরিই হতো তবে তার ব্যাপারে আল্লাহ্ ইচ্ছা করলে তাকে জান্নাতে দেবেন একথা বলা হতো না ( যেহেতু কাফির জান্নাতে প্রবেশ করে না। ) [আল-মুগনী]

তিনি সলাত ত্যাগ কারীকে কাফির না বলার বিষয়ে আরো বিস্তারিত বলেন,

এ বিষয়ে মুসলিমদের ইজমা হয়েছে। আমরা এমন কোনো ঘটনা শুনিনি যে, কোনো একটি যুগে কোনো একজন সলাত ত্যাগকারীকে (মৃত্যুর পর) গোসল দেওয়া, কাফন পরানো এবং মুসলিমদের কবরস্থানে কবর দেওয়া হয়নি। তার ওয়ারিসদের তার সম্পত্তি হতে বঞ্চিত করা হয়নি আবার তাকেও তার ফারাজ থেকে বঞ্চিত করা হয়নি। তাদের স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বৈবাহিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করা হয়নি। অথচ প্রচুর সংখ্যক মানুষ ছিল যারা সলাত পরিত্যাগ করতো। যদি সে কাফির বলে গণ্য হতো তবে এই সকল বিধান প্রয়োগ করা হতো। মুসলিমদের মাঝে এ বিষয়ে আমরা কোনো দ্বিমত দেখি না যে, সলাত ত্যাগ কারী পরবর্তীতে সলাত কাজা আদায় করে নেবে। যদি সে মুরতাদ (কাফির) বলেই গণ্য হতো তবে তাকে পূর্বের সলাত বা সওম কাজা করতে হতো না। (আল-মুগনী)

ইবনে কুদামার এই কথার উপর চিন্তা করলেই দেখা যাবে সাধারনভাবে সকল প্রকার সলাত ত্যাগ কারীকে কাফির ঘোষণা করা মূলত উম্মতের ঐক্যমতের বিপরীতে মত দেওয়া। একারণে ইবনে রুশদ আল-মালিকী রঃ বলেন, এই মতটি (সলাত ত্যাগ কারীকে কাফির বলা) পাপী মুসলিমকে কাফির বলার মতোই (অর্থাৎ খারেজীদের মতো)। (বিদাইয়াতুল মুজতাহিদ)

বুখারী শরীফের একটি হাদীসে এসেছে মুমিনরা জাহান্নামে প্রবেশ করেছে এমন কিছু ব্যক্তি সম্পর্কে আল্লাহর নিকট সুপারিশ করে বলবে, হে আমাদের রব আমাদের এই সকল মুমিন ভাইরা আমাদের সাথে সলাত আদায় করতো ও সওম পালন করতো। আল্লাহ বলবেন যাও যার মধ্যে এক দিনার পরিমান ঈমান পাওয়া যাবে তাকে বের করে আনো। তখন তারা তাদের বের করে আনবে।

এই হাদীসের শেষে বলা হয়েছে ফেরেস্তা, নবী ও নেককার লোকেরা শাফায়াত করার পর আল্লাহ বলবেন সকলে শাফায়াত করেছে এখন কেবল আমার শাফায়াত বাকী আছে। তখন তিনি এমন কিছু লোককে জাহান্নাম হতে বের করবেন যারা কখনও কোনো ভাল আমল করেনি। (সহীহ বুখারী)

শায়েখ আলবানী এই হাদীস থেকে সলাত ত্যাগকারী কাফির না হওয়ার ব্যাপারে দলীল দিয়েছেন। কারণ হাদীসে প্রথমেই বলা হয়েছে যারা সলাত পড়তো কিন্তু জাহান্নামী হয়েছিল মুমিনরা শাফাআত করে তাদের বের করে আনবে আর শেষে বলা হচ্ছে সমস্ত সৃষ্টির শাফাআত শেষ হয়ে গেলে আল্লাহ তায়ালা এমন কিছু লোককে বের করে আনবেন যারা কখনও কোনো ভাল আমল করেনি। এ থেকে বোঝা যায় আল্লাহ তায়ালা তাদের জাহান্নাম হতে বের করবেন যারা সলাত ত্যাগ করতো কিন্তু মুমিন ছিল। আর আল্লাহই ভাল জানেন।

এই সকল দলীল প্রমাণের মধ্যে সমন্বয় সাধনের উদ্দেশ্যে জমহুর ওলামায়ে কিরাম বলেছেন, যেখানে সলাত ত্যাগ করাকে কুফরী বলা হয়েছে সেখানে প্রকৃত কুফরী বোঝানো হয়নি বরং বিষয়টির ভয়াবহতা বোঝানোর জন্য কুফরীর সাথে তুলনা করা হয়েছে।

প্রশিদ্ধ ওলামায়ে কিরামের মাঝে যারা সলাত ত্যাগ কারীকে কাফির বলার পক্ষে মত ব্যক্ত করেছেন বলে বর্ণিত আছে তারাও এই সকল দলিল-প্রমানের কারণে বিভিন্নভাবে নিজেদের মতামতের স্বপক্ষে এমন সব ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ উল্লেখ করেছেন যাতে প্রমাণিত হয় সাধারনভাবে সলাত পরিত্যাগ করা তাদের মতেও প্রকৃত অর্থে কুফরী নয়। যদি না তার সাথে আল্লাহর দ্বীনকে অবজ্ঞা করার মতো বিষয় সংশ্লিষ্ট থাকে।

এ বিষয়ে ইমাম তাইমিয়া, ইমাম শাওকানী প্রমুখ ওলামায়ে কিরামের বক্তব্য বিশেষভাবে দ্রষ্টব্য। যদিও তারা সলাত ত্যাগকারীকে কাফির বলার পক্ষে মত দিয়েছেন কিন্তু এ বিষয়ে বিস্তারিত মতামত বর্ণনার সময় এমনভাবে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ উল্লেখ করেছেন যাতে প্রমাণিত হয় তারা সকল প্রকার সলাত ত্যাগকারীকে কাফির বলেন নি বরং তাদের মধ্যে যারা অবজ্ঞাভরে সলাত পরিত্যাগ করে মূলত তাদের কাফির বলেছেন। ইমাম ইবনে তাইমিয়া রঃ এ বিষয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে দুটি বিষয়ের উপর বিশেষ জোর দিয়েছেন। তার মধ্যে একটি হলো, যখন কাউকে সলাত পরিত্যাগ করার অপরাধে কাপড়াও করা হয় এবং তাকে হত্যা করা হয় তখন সে কাফির অবস্থায় নিহত হয়। যারা ঐ অবস্থায় যদি তার অন্তরে সলাত ফরজ বিশ্বাস থাকে তবে সে কাফির হবে না তিনি তাদের মতামত খন্ডায়ন করে বলেন,

কেউ অন্তরে সলাত পড়ার আবশ্যকতা স্বীকার করবে কিন্তু সলাত পড়ার জন্য তাকে হত্যা করা হলেও সে সলাত পড়বে না এটা সম্ভব নয়। (মাজমুয়ায়ে ফাতাওয়া)

অর্থাৎ তিনি বলতে চেয়েছেন, যে ব্যক্তিকে সলাত পরিত্যাগ করার কারণে হত্যা করা হয় তবু সে সলাত পড়ে না তার অন্তরে সলাত পড়া আবশ্যক এই বিশ্বাস নেই তাই সে কাফির হবে।

এরপর তিনি দ্বীতীয় যে বিষয়টির উপর আলোকপাত করেছেন তা হলো, যদি একজন ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করে কিন্তু তার সারাটা জিন্দিগীতে সে একটিবারের জন্যও আল্লাহর উদ্দেশ্যে সাজদা অবনত হয় না। সে সলাত পড়া আবশ্যক এটা স্বীকার করে এমন বলা যেতে পারে না। একারনে তাকে মুসলিম বলা যায় না। এ সম্পর্কে তিনি বলেন,

যে ব্যক্তি সলাত ত্যাগ করার ব্যাপারে অনড় থাকে। জীবনে কখনও সলাত পড়ে না এবং এভাবেই মৃত্যুবরণ করে তবে সে মসলিম নয়। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষ মাঝে মাঝে সালাত পড়ে আবার মাঝে মাঝে পরিত্যাগ করে এরা নিয়মিত সলাত পড়ে না। এদের ব্যাপারেই শাস্তির ভয় দেখানো হয়েছে। এদের ব্যাপারেই রাসুলুল্লাহ সাঃ এর এই হাদীসটি প্রযোজ্য-পাঁচ ওয়াক্ত সলাত আল্লাহ বান্দার উপর ফরজ করেছেন যে এগুলো আদায় করে এবং এর মধ্যে কোনো ত্রুটি করে না এর হক নষ্ট করে না তবে আল্লাহর নিকট তার জন্য এই ওয়াদা রয়েছে যে তিনি তাকে ক্ষমা করবেন আর যে এগুলো আদায় করেনা আল্লাহর নিকট তার জন্য কোনো ওয়াদা নেই। আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাকে শাস্তি দেবেন ইচ্ছা করলে জান্নাতে দেবেন। (মাজমুয়ায়ে ফাতাওয়া)

এ কথার উপর চিন্তু করলে দেখা যাবে ইমাম ইবনে তাইমিয়া সাধারনভাবে সকল প্রকার সলাত ত্যাগকারীর উপর কুফরীরর ফতোয়া আরোপ করছেন না বরং যে ব্যাক্তি সারা জীবনে একবারও সলাত পড়েনি সেই ব্যক্তিকে কাফির বলেছেন। তার এ মতটিও জমহুর (বেশিরভাগ) আলেমের মতের বিপরীতে তবু আমরা বলবো, এ মতের আলোকে আমাদের সময়কার বেশিরভাগ লোক কুফরীর আওতা বহির্ভূত। যেহেতু জীবনে একবারও সলাত আদায় করেনি এমন লোক তালাশ করে পাওয়া দূরহ ব্যাপার। যারা যে কোনো প্রকার সলাত ত্যাগকারীকে কাফির মনে করে তারা নিজেদের স্বপক্ষে ইবনে তাইমিয়ার মত উল্লেখ করে থাকেন। এটা সঠিক নয়।

ইমাম শাওকানী রঃ সলাত ত্যাগ করা কুফরী এটা উল্লেখ করার পর বলেন,

সলাত ত্যাগ করার গোনা ক্ষমা হতে পারে এ বিষয়ে বর্ণিত হাদীসগুলো আমাদের মতের বিপরীতে নয় কেননা আমরা বলবো কিছু কিছু কুফরী তো এমন আছে যা ক্ষমার অযোগ্য নয়। (নিলুল আওতার)

আবুল আলা আল-মোবারোকপুরী তিরমিযীর ব্যাখ্যা তুহ্ফাতুল আহ্ওয়াযীতে বলেন,

যদি তুমি ইমাম শাওকানীর এই কথার ব্যাপারে চিন্তা করো তবে দেখবে তিনি সলাত ত্যাগকারীকে কাফির বলেছেন আর জমহুর ওলামায়ে কিরাম কাফির বলেন নি এখানে মূলত শাব্দিক মতভেদ সৃষ্টি হয়েছে (মৌলিকভাবে এখানে কোনো দ্বিমত নেই)। কারণ জমহুর ওলামায়ে কিরাম যেমন সলাত ত্যাগকারী চিরস্থায়ী জাহান্নামী হবে এমন মনে করেন না এবং সুপারিশ (ক্ষমা) হতে বঞ্চিত হবে এমন মনে করেন না। ইমাম শাওকানীও তা মনে করেন না।

অর্থাৎ ইমাম শাওকানী একটু ভিন্নভাবে সলাত ত্যাগকারীর ব্যাপারে জমহুর ওলামায়ে কিরামের পক্ষেই মত দিয়েছেন।

আমরা পুনরায় বলবো, “সলাত ত্যাগ করা কুফরী” এই অর্থে যা কিছু বর্ণিত হয়েছে জমহুর ওলামায়ে কিরামের নিকট সেটা প্রকৃত অর্থে কুফরী নয়। যারা ঐ সকল হাদীস হতে সলাত ত্যাগকারীর উপর কুফরীর ফতোয়া আরোপ করেছেন তারাও সাধারনভাবে সকল সলাত ত্যাগকারীর উপর তা প্রয়োগ করেন নি বরং যাকে সলাত পড়ার আদেশ দেওয়া হয় এবং সলাত না পড়লে হত্যার হুমকী দেওয়া হয় তারপরও সলাত পড়ে না বা জিন্দেগীতে একটি বারের জন্যও আল্লাহর সামনে সাজদা অবনত হয়না এমন হতভাগাদের উপর তারা কুফরীর ফতোয়া আরোপ করেছেন। বর্তমানে যারা সকল প্রকার সলাত ত্যাগকারীর উপর ঐসব হাদীস প্রয়োগ করে তারা এ বিষয়ে স্পষ্ট ভ্রান্তির মধ্যে রয়েছে। নিজেদের মতের স্বপক্ষে ঐ সকল হাদীস পেশ করে তারা দূরদর্শিতার প্রমাণ দিয়েছেন।

ঐসকল হাদীস ছাড়াও তারা আরো কিছু দলিল উপস্থাপণ করে থাকে যা সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক ও অজ্ঞতাপ্রসূত। যেমন, আল্লাহর বাণী,

যদি তারা শিরক-কুফর হতে ফিরে আসে, সলাত কায়েম করে এবং যাকাত দেয় তবে তারা তোমাদের দ্বীনী ভাই( সুরা তাওবা-১১)

তারা বলে এই আয়াত স্পষ্ট প্রমাণ করে  যে, যারা সলাত কায়েম করে না তারা মুসলিমদের দ্বীনী ভাই নয় অর্থাৎ তারা কাফির।

যে দ্বীনী ভাই নয় সে কাফির এই কথাটি সঠিক নয়। কারণ ‘দ্বীনী ভাই’ কথাটি সম্মান ও সৌহার্দের প্রতীক। নেককার ও অতি উত্তম লোক ছাড়া কারো ক্ষেত্রে এটা প্রয়োগ করা যায় না। একজন মদ্যপ, জেনাকার সন্ত্রাসীকে দ্বীনী ভাই বলা যেতে পারে না। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, সে বেদ্বীন, কাফির। এ বিষয়ে স্পষ্ট প্রমাণ আল্লাহর বাণী,

যারা ঈমান এনেছে কিন্তু (সামার্থ থাকা সত্ত্বেও) হিজরত করে নি তাদের সাথে তোমাদের কোনো সম্পর্ক নেই যতক্ষণ না তারা হিজরত করে চলে আসে। তবে যদি তারা দ্বীনের খাতিরে তোমাদের সহযোগিতা চায় তবে তাদের সহযোগিতা করা তোমাদের দায়িত্ব। (আনফাল-৭২)

এই আয়াতে যারা হিজরত করেনি বরং ইচ্ছাকৃতভাবে কাফিরদের ভূখন্ডে অবস্থান করেছে। মুসলিমদের বলা হচ্ছে তোমাদের সাথে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সাঃ বলেন, “যে মুসলিম মুশরিকদের এলাকায় বসবাস করে তার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।” (আবু দাউদ)[আল-হাইছামী বলেন, এই হাদীসের রাবীরা বিশ্বস্ত। শায়েখ আলবানী হাদীসটিকে সহীহ্ বলেছেন][সহীহু আবু দাউদ-২৩৭৭) কিন্তু এই সম্পর্কহীনতা ঐ সকল ব্যক্তিদের কুফরী প্রমাণ করে না। একারণে উক্ত আয়াতে এবং এই হাদীসে “তারা ঈমান এনেছে” বা তারা মুসলিম এই কথাটি বলা হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাদের সাথে সম্পর্কহীনতার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। সুতরাং অমুক আমার দ্বীনী ভাই এই সম্পর্ক অস্বীকার করলেই উক্ত ব্যক্তি বেদ্বীন, কাফির এমন প্রমাণিত হয় না।

তাছাড়া উক্ত আয়াতে সলাতের সাথে সাথে যাকাতের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু যারা সলাত ত্যাগকারীকে কাফির প্রমান করার জন্য উপরোক্ত আয়াত প্রয়োগ করে তাদের বেশিরভাগই যাকাত না দিলে কাউকে কাফির বলে না। এই ধরনের দ্বিমুখিতা সত্ত্বেও আয়াতটি নিজেদের পক্ষে দলিল হিসেবে ব্যবহার করা তাদের জন্য শোভনীয় নয়।

এ বিষয়ে তাদের পক্ষ থেকে অনুরুপ আরেকটি দলিল উত্থাপন করা হয়। কাফিরদের সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন,

তোমাদের কি কারণে সাকার নামক জাহান্নামে প্রবেশ করতে হলো? তারা বলবে, আমরা তো সলাত আদায় করতাম না, গরীব মানুষকে খাবার খাওয়াতাম না, আল্লাহর দ্বীন নিয়ে যারা তামাশা করতো তাদের সাথে তামাশা করতাম এবং আল্লাহর দ্বীনকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করতাম। (মুদ্দাচ্ছির: ৪২-৪৬)

তারা বলে, এই আয়াতে কাফিরদের সাকার নামক জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হিসেবে সলাত পরিত্যাগ করার কথা বলা হয়েছে। অতএব, সলাত পরিত্যাগ করা অবশ্যই কুফরী। এই কথাটিও সঙ্গত নয় কারণ এখানে সলাতের সাথে সাথে মিসকীনকে খাবার দিতাম না একথাও বলা হয়েছে। তবে কি মিসকীনকে খাবার না দেওয়া কুফরী? তাছাড়া কোনো অপরাধে জাহান্নামে যাওয়ার সম্ভবনা রয়েছে তবে তার ঈমান থাকলে একদিন পুনরায় জান্নাতে প্রবেশ করবে। যদি কেউ বলে, সাকার নামক জাহান্নামে কেবল কাফিররাই যায় মুমিনরা নয় তবে আমরা বলবো, আয়াতের শেষে বলা হয়েছে, আমরা আল্লাহর দ্বীন নিয়ে তামাশা করতাম এবং আল্লাহর দ্বীনকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করতাম। এ দুটি বিষয় স্পষ্ট কুফরী। এই সকল কুফরীর সাথে সাথে অন্য যা কিছু অপরাধ তারা করেছিল সেগুলোর শাস্তি স্বরুপ তারা সাকার নামক জাহান্নামে প্রবেশ করেছে কেবল সলাত ত্যাগ করার কারণে নয়।

এরকম আরেকটি আয়াত হলো,

তাদের পর কিছু লোক আসলো যারা সলাত পরিত্যাগ করলো এবং কামনা-বাসনার অনুসরণ করলো ফলে খুব শীঘ্রই তাদের ‘গয়’ নামক জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। (সুরা মারইয়াম-৫৯)

তারা বলেন, ‘গয়’ নামক জাহান্নামে নিক্ষেপ করার মতো ভয়ংকর শাস্তি কেবল কাফিরকেই দেওয়া যায় অন্য কাউকে নয়। অতএব, যে সলাত ত্যাগ করে সে কাফির না হলে ‘গয়’ নামক জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হতো না। এর উত্তরে আমরা একই কথা বলবো অর্থাৎ ‘গয়’ নামক জাহান্নামে যে কেবল কাফিরকে নিক্ষেপ করা হয় অন্য কোনো পাপীকে নয় সেটা প্রমাণিত নয় আর যদি ধরেও নিই ‘গয়’ নামক জাহান্নামে কেবল কাফিরকে নিক্ষেপ করা হয় তবু এর মাধ্যমে সলাত পরিত্যাগ করা কুফরী প্রমাণিত হয়না যেহেতু আয়াতে কেবলমাত্র সালাত পরিত্যাগ করার কারণে ‘গয়’ নামক জাহান্নামে নিক্ষেপ করার কথা বলা হয় নি। বরং সেই সাথে তারা কামনা-বাসনার অনুসরণ করেছিল এমন বলা আছে। প্রশ্ন হলো, কামনা-বাসনার অনুসরণ করাও কি তবে কুফরী? যদি বাসনার বশবর্তী হয়ে মদ পান করে বা জেনা করে সেও কি ‘গয়’ নামক জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হওয়ার কারণে কাফির হবে? আর যদি বলা হয় কামনা-বাসনার অনুসরণ করে তারা অন্য কোনো কুফরী কাজে লিপ্ত হয়েছিল তবে বলবো, তারা সেই কুফরীর কারণেই ‘গয়’ নামক জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হয়েছে এবং সেই সাথে সলাত পরিত্যাগ করার শাস্তিও ভোগ করেছে। মোট কথা, এ আয়াতের মাধ্যমে সলাত ত্যাগ করা কুফরী প্রমাণ করার কোনো উপায় নেই।

যারা এই সকল অস্পষ্ট ও অসঙ্গত দলিল প্রমাণ উল্লেখ করে সাধারন মুসলিমদের কাফিরে পরিনত করার সংগ্রামে লিপ্ত আছেন আমরা তাদের অনুরোধ করে বলবো, আপনারা মুসলিমদের রক্ত-সম্পদ ও ঈমান-আক্বীদার উপর হামলা করা হতে বিরত থাকুন। যেহেতু রাসুলুল্লাহ সাঃ বলেছেন, যে কেউ অন্য মুসলিমকে কাফির বলে যদি সে কাফির না হয় তবে সে ফতোয়া তার নিজের দিকেই ফিরে আসে। এ কঠোরতার কারণে এবং ঈমান ও ইসলামের সম্মান ও মর্যাদার কারণে ওলামায়ে কিরাম কাউকে কাফির বলার ব্যাপারে অত্যাধিক সতর্কতা অবলম্বন করতেন। সামান্য পরিমান সন্দেহ ও সংশয় সৃষ্টি হলেই তারা কাউকে কাফির বলা হতে বিরত থাকতেন। একারণে খারেজী, কাদরিয়া, মু’তাজিলাদের মতো কট্টরপন্থী বিদয়াতীদের ক্ষেত্রেও বেশিরভাগ আলেম কুফরী ফতোয়া দেন নি। যে বিষয়ে আলেমরা দ্বিমত করেছেন বিজ্ঞ ওলামায়ে কিরাম তার উপর নির্ভর করে কাউকে কাফির বলেন না।

শায়খ মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহাব রঃ বলেন, ইসলামের পাঁচটি রুকন। এগুলোর মধ্যে প্রথম হলো কালেমার স্বাক্ষ্য দেওয়া, এর পর চারটি রুকন। যদি কোনো ব্যক্তি এই চারটিকে মেনে নেই কিন্তু অলসতার কারণে তা পরিত্যাগ করে তবে আমরা তাদের সাথে যুদ্ধ করবো কিন্তু তাদের কাফির বলব না। আলেমরা এই চারটি বিষয় যে পরিত্যাগ করে সে কাফির হবে কি না সে ব্যাপারে ইখতিলাফ করেছেন। আমরা কেবল সেই বিষয়ের উপর ভিত্তি করেই কাউকে কাফির বলব যে সিষয়ে সমস্ত আলেম একমত হয়েছেন আর তা হলো কালেমার সাক্ষ্য দেওয়া। (আদ দুরার আস সানিয়্যা)

কাজি ইয়াদ রঃ বলেন, একজন মসলিমের এক সিঙ্গা পরিমাণ রক্ত ঝরানোর ব্যাপারে ভুল করা এক হাজার জন কাফিরকে ছেড়ে দেওয়ার তুলনায় বেশি মারাত্মক অপরাধ। (আশ শিফা)

উপরের আলোচনাতে আমরা আল্লাহর দ্বীন নিয়ে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা বা হাসি তামাশা করার বিভিন্ন উদাহরণ পেশ করেছি। অজ্ঞ ও মুর্খ লোকেরা এছাড়াও আরো বিভিন্ন কথা-বার্তা বলে থাকে যার কিছু অংশ এতটাই ধৃষ্টতাপূর্ণ যে তা মুখে আনা বা কলমে লেখাও বেয়াদবী বলে গণ্য তাই সেসব বিষয় উল্লেখ করা হতে আমরা বিরত থেকেছি। এটিই বরেণ্য ওলামায়ের নিকট অনুসৃত নীতি।

কাজী ইয়াদ রঃ বলেন, বহুসংখক নির্বোধ কবিরা (আল্লা সম্পর্কে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেছে) এবং তাদের নিন্দা করে যারা বই লিখেছে তারাও এ বিষয়ে বাড়াবাড়ি করেছে। তারা আল্লাহ তায়ালার সুউঁচ্চ সম্মানের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করেছে। তারা (ঐ সকল কবিদের কথার প্রতিবাদের উদ্দেশ্যে) তাদের কিতাব সমূহতে এমন সব কথা উল্লেখ করেছে যা উল্লেখ করা হতে আমরা আমাদের কলম ও কিতাবকে পবিত্র রেখেছি। যদি প্রতিটি কথা যেভাবে বলা হয়েছে সেভাবে উল্লেখ করার উচ্ছা না করতাম তবে পূর্বে যেসব মারাত্মক কথা উল্লেখ করেছি তাও উল্লেখ করতাম না। (আশ শিফা)

অর্থাৎ তিনি প্রতিবাদের উদ্দেশ্যেও কবি বা নির্বোধ লোকদের কথা অতিরিক্ত উল্লেখের নিন্দা করেছেন। কারণ কুফরী কথার প্রতি ঘৃণা প্রদর্শন করার এটাও একটি অংশ যে অতি প্রয়োজন ছাড়া তা উল্লেখ না করা।

বর্তমানে দেখা যায় নাস্তিক-মুরতাদরা ইসলাম ও আল্লাহ-রাসুল সম্পর্কে এমন সব অবমাননামূলক মন্তব্য করে থাকে যা চূড়ান্ত পর্যায়ের অশ্লীল ও অশালীন। তাদের উপর আল্লাহ্ অভিসাপ। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, ঐ সকল নাস্তিকদের কথার প্রতিবাদ করতে যেয়ে কেউ কেউ মসজিদে বা ময়দানে সাধারন মুসলিমদের সামনে বারবার ঐ সকল কুরুচিপূর্ণ কথাগুলো হুবহু উল্লেখ করেন। তারা এটা লক্ষ্য করেন না যে, মুর্খ লোকেরা যে ভাষায় আল্লাহ-রাসুলকে গালি দেয় তা হুবহু উল্লেখ করাও এক প্রকার ধৃষ্টতা। এমন বলাই তো যথেষ্ট্য যে, তারা খুব অশ্লীল ভাষা প্রয়োগ করেছে যা মুখে আনা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। যদি কেউ কারো বাবা-মাকে অশ্লীল ভাষায় গালি দেয় তবে বাবা-মার নিকট নালিশ করার সময় সেটা হুবহু শুনিয়ে দেওয়াটা নিশ্চয় ভদ্রতা ও শালীনতা হতে পারে না। বরং আকারে-ইঙ্গিতে বিষয়টি বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করাই সর্বোত্তম। তবে বিশেষ প্রয়োজনে কিছু কিছু বিষয় বর্ণনা করা যেতে পারে। আল্লাহ আমাদের সঠিক পথ প্রদর্শন করুন। আমীন।

সলাত ত্যাগকারীর বিধান শায়েখ আব্দুল্লাহ আল মুনির এর গবেষনা মুলক প্রবন্ধটি পড়া শেষ হলে আপনার বন্ধুদের মাঝে শেয়ার করতে ভুলবেন না।

ট্যাগঃ সলাত ত্যাগকারীর বিধান , সলাত ত্যাগকারীর বিধান , সলাত ত্যাগকারীর বিধান , সলাত ত্যাগকারীর বিধান , সলাত ত্যাগকারীর বিধান , সলাত ত্যাগকারীর বিধান , সলাত ত্যাগকারীর বিধান , সলাত ত্যাগকারীর বিধান , সলাত ত্যাগকারীর বিধান , সলাত ত্যাগকারীর বিধান , সলাত ত্যাগকারীর বিধান , সলাত ত্যাগকারীর বিধান , সলাত ত্যাগকারীর বিধান

Leave a Reply

Your email address will not be published.