সম্মিলিত মুনাজাতের বিধান – শায়েখ আব্দুল্লাহ আল-মূনীর গবেষণা মূলক প্রবন্ধ

সম্মিলিত মুনাজাতের বিধানশায়েখ আব্দুল্লাহ আল-মূনীর গবেষণা মূলক প্রবন্ধ। প্রবন্ধটি পড়া শেষ হলে শেয়ার করতে ভুলবেন না।

আমরা জানি পাঁচ ওয়াক্ত সলাতের পর সম্মিলিত মোনাজাত রাসুলুল্লাহ সাঃ বা সাহাবায়ে কিরামের সময় প্রচলিত ছিল না কিন্তু বিষয়টি সামগ্রিকভাবে শরীয়তের মানদন্ডে গ্রহণযোগ্য। যেহেতু ফরজ সলাতের পর দোয়া করা হলে তা আল্লাহর দরবারে বিষেশভাবে কবুল হয় বলে হাদীসে উল্লেখ আছে। দোয়া করার সময় হাত উত্তোলন করার ব্যাপারেও সহীহ হাদীস বর্ণিত আছে। দোয়া-যিকির ইত্যাদি কর্মকান্ড সম্মিলিতভাবে করার ফজিলত সম্পর্কেও হাদীস বর্ণিত আছে। এসবই আমরা পূর্বে (বিদায়াতে দ্বলালা বইয়ে) উল্লেখ করেছি। এখনে তার পুনরাবৃত্তি করা সঙ্গত মনে হয় না। এই সকল কারণে পাঁচ ওয়াক্ত সলাতের পর মোনাজাত একটি উত্তম কাজ হিসেবে গণ্য যদি না কেউ বিষয়টিকে সলাতের অংশ মনে করে বা আবশ্যক মনে করে। আমরা বলেছি, এক সময় মানুষের মধ্যে এই ধরণের আক্বীদা-বিশ্বাস বিদ্যামান ছিল এটা সঠিক কিন্তু এখন বেশিরভাগ মানুষ আর এমন মনে করে না। অতএব, সম্মিলিত মোনাজাত এখন আর সমস্যার বিষয় নয়। তবে আলেম-ওলামাদের সজাগ থাকতে হবে যাতে সাধারণ মানুষ এবিষয়ে বিকৃত ধ্যান ধারনার বশবর্তী না হয়। মোনাজাতের সঠিক বিধান কি সে সম্পর্কে মানুষকে অবহিত করাই এখানে যথেষ্ট বিবেচিত হবে। যে কোনো মূল্যে মোনাজাতকে গোড়া শুদ্ধ উপড়ে ফেলতেই হবে এই চিন্তু ধারা সঠিক নয়। মূলত এ কারণেই যুগের পর যুগ মুসলিম সমাজে সলাতের পর সম্মিলিত মোনাজাত চালু রয়েছে। বিচক্ষণ ওলামায়ে কিরাম এটা সসর্ব বাতিল হিসেবে ঘোষণা করেন নি। এবং এর বিরুদ্ধে আমরণ সংগ্রামে লিপ্ত হন নি। কেউ কেউ অবশ্য বিষয়টিকে বিদয়াত হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন তবে তারাও এটাকে অনুত্তম বা অপছন্দনীয় কাজ মনে করেছেন নিষিদ্ধ বা হারাম নয়। একারণে এটার বিরুদ্ধে রক্তাক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়া সঠিক মনে করেননি।

মালেকী মাজহাবের ফকীহ্ ইবনে নাজি বলেন,

আমাদের এখানে অর্থাৎ আফ্রিকাতে (সম্মিলিত মোনাজাত) বৈধ হওয়ার মতটিই সবার নিকট গৃহীত হয়েছে। যেসব আলেমের সাথে আমি সাক্ষাত করেছি তাদের কেউ কেউ এটার পক্ষাবলম্বন করতেন। (মাওয়াহিবুল জালিল, আল ফাওয়াকিহ আদ-দাওয়ানি)

ইমাম মালিক বিষয়টিকে অপছন্দ করেছেন। তিনি মনে করেছেন এর মাধ্যমে ইমামের অন্তরে অহংকার সৃষ্টি হবে। যেহেতু তাকে মুক্তাদিদের পক্ষ হতে আল্লাহর দরবারে দোয়া করার ব্যাপারে মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা হচ্ছে।

এ সংশয়টির উত্তর দিয়ে ইবনে নাজি বলেন,

বরং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় যাকে দিয়ে দোয়া করানো হয় তিনি বিনম্রতা ও কোমলতা প্রকাশ করেন। অতএব বিষয়টি পরিত্যাগ করা যাবে না বরংকরতে হবে। (আল-ফাওয়াকিহ আদ-দাওয়ানী)

তিনি আরও বলেন,

সব নতুন সৃষ্ট বিষয়ই তো আর পথভ্রষ্টতা নয় বরং তার মধ্যে কিছু বিষয় রয়েছে উত্তম। আর এ ধরণের কাজ সম্মিলিতভাবে আদায় করলে তাতে উৎসাহ উদ্দীপনা বৃদ্ধি পায়। (আল ফাওয়াকিহ আদ-দাওয়ানী)

একথা উল্লেখের পর আল ফাওয়াকিহ আদ-দাওয়ানীর লেখক বলেন,

আমি বলব, বৃষ্টি প্রার্থনা ও অন্যান্য স্থানে যে শরীয়তে সম্মিলিত মোনাজাতের বিধান রয়েছে এটা ইবনে নাজি যা বলেছেন তার পক্ষে উত্তম দলিল। মালেকী মাজহাবের অন্য এক ফক্বীহ ইবনে আরাফাও সম্মিলিত মোনাজাতের পক্ষাবলম্বন করেছেন। (মাওয়াহিবুল জালিল)

কেউ কেউ বলেছেন কেবল ফজর ও আসরের পর দোয়া করা উচিৎ অন্যান্য সলাতের পরে নয় তাদের মতামত খন্ডায়ন করে ইমাম নাব্বী রঃ বলেন,

সঠিক মত হলো প্রতিটি সলাতের পরই এটা (দোয়া করা) মুস্তাহাব। ইমাম সলাতের শেষে মানুষের দিকে মুখ ফিরিয়ে দোয়া করবেন। (আল-মাজুম)

ইবনে মুফলিহ রঃ বলেন, ইমাম ফজর ও আসরের পর দোয়া করবেন যেহেতু এই দুটি সময় ফেরেস্তারা হাজির থেকে আমিন বলেন। সঠিক মত অনুযায়ী অন্যান্য সলাতের পরও দোয়া করবেন। (আল-ফুরু) কেউ কেউ পাঁচ ওয়াক্ত সলাতের শেষে সম্মিলিত মোনাজাত নিষিদ্ধ হওয়ার স্বপক্ষে যুক্তি দিয়ে বলে, সলাতের শেষে কিছু মাসনুন (সুন্নাত) দোয়া যিকির রয়েছে। সম্মিলিত মোনাজাতের কারণ মানুষ সেগুলো পরিত্যাগ করে। অতএব, সম্মিলিত মোনাজাত পরিত্যাগ করা উচিৎ। এর উত্তরে আমরা বলব, ফরজ সলাতের শেষে রাসুলুল্লাহ সাঃ যেসব দোয়া পাঠ করেছেন বলে বর্ণিত আছে সেগুলোর সংখ্যা অনেক। কেউ কেউ এ বিষয়ে পৃথক পুস্তিকাও রচনা করেছেন। এটা প্রমাণ করে যে, রাসুলুল্লাহ সাঃ প্রতি সলাতের শেষে সবগুলো দোয়া একত্রে পাঠ করতেন তা নয় বরং বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দোয়া পাঠ করতেন। অতএব, সলাতের শেষে মাসনুন দোয়া বলতে বেশ কিছক্ষণ সময় নিয়ে এই সকল দোয়া একত্রে পাঠ করা বোঝায় না বরং এগুলোর মধ্যে যে কোনো একটি পাঠ করাই যথেষ্ট। সলাতের শেষে ইমাম মোনাজাত করার পূর্বে সাধরনত কিছু সময় অপেক্ষা করেন। এই সময়ের মাঝে মাসনুন দোয়াগুলির মধ্যে কোনো একটি আদায় করে নেওয়া সম্ভব। যার পক্ষে এটা সম্ভব না হয় বা মাসনুন দোয়া শেষ করার পূর্বেই যদি ইমাম মোনাজাত শুরু করে দেয় তবে ঐ ব্যক্তি মোনাজাতে অংশ গ্রহণ না করে দোয়া পাঠ চালিয়ে যেতে পারে। যে মোনাজাত করতে চায় না তাকে তো মোনাজাত করতে বাধ্য করা হচ্ছে না। এই সুযোগ বিদ্যামান থাকা সত্ত্বেও যারা মাসনুন দোয়া পাঠ করে না, তাদের ক্ষেত্রে কি একথা বলা যায় যে, ইমাম মোনাজাত না করলে তারা মাসনুন দোয়া পাঠ করতো? সামান্য চিন্তা করলে দেখা যাবে ব্যাপার সম্পূর্ণ উল্টো। ইমাম মোনাজাত করে বিধায় বেশিরভাগ লোক মোনাজাতের আশায় বসে থাকে এবং কিছু দোয়া-দরুদ পাঠ করে। যদি ইমাম মোনাজাত না করতেন তবে সালাম ফিরানোর সাথে সাথেই তারা মসজিদ থেকে বের হয়ে পড়তো। তাছাড়া অনেক সময়ই ইমাম নিজেই মোনাজাতের মধ্যে কোনো না কোনো মাসনুন দোয়া পাঠ করেন এবং মুছল্লীরা আমীন বলার মাধ্যমে তাতে শরীক হয়। এভাবে দোয়াটি যার মুখস্ত নেই সেও এর ফজিলত প্রাপ্ত হয়। এ পদ্ধতিতে মাসনুন দোয়া শিখে  নেওয়াও মুছল্লীদের জন্য সহজ হয়। দেখা যাচ্ছে, সম্মিলিত মোনাজাত মাসনুন দোয়া পাঠের ব্যাপরে বাধাঁ তো নয়ই বরং সহযোগী। সুতরাং সলাতের পর বা অন্য যে কোনো সময় সম্মিলিত মোনাজাত করার ব্যাপারটি নিয়ে কঠোরতা প্রদর্শনের প্রয়োজনীয়তা নেই।

সম্মিলিত মুনাজাতের বিধান – শায়েখ আব্দুল্লাহ আল-মূনীর গবেষণা মূলক প্রবন্ধটি পড়া শেষ হলে শেয়ার আাপনার বন্ধুদের মাঝে শেয়ার করুন। এবং সম্মিলিত মুনাজাতের বিধান প্রবন্ধ সম্মন্ধে আপনার মতামত করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.