শাবান মাসের অর্ধ রজনীকে শবে বরাত বলা যাবে কিনা – শায়েখ আব্দুল্লাহ আল মুনীর

শবে বরাত বলা যাবে কিনা – শাবান মাসের অর্ধ রজনীকে – শায়েখ আব্দুল্লাহ আল মুনীর এর অন্যান্য গ্রন্থ ও লেকচারের জন্য আমাদের সাইটে নজর রাখুন

শাবান মাসের মাঝ রাতকে আরবীতে বলা হয় লাইলাতুন নিসফ মিন শাবান বিভিন্ন গ্রন্থে এই রাতকে লাইলাতুল বারাআ হিসাবে নামকরণ করা হয়েছে। আবুল আলা মুহাম্মাদ আব্দুর রহমান বলেন,

এটা হচ্ছে শাবান মাসের ১৫ তারিখ এ রাতকে লাইলাতুল বারাআও বলা হয়। (তুহফাতুল আহওয়াযী)

বদরুদ্দীন আল আইনী বলেন,

লাইলাতুস সক হলো লাইলাতুল বারাআ আর সেটা হলো শাবান মাসের মাঝ রাত। (উমদাতুল কারী)

আল বাহরুর রায়েকে বলা হয়েছে, লাইলাতুল বারাআর রাতে রাস্তা ও বাজার বা মসজিদ সমূহ বাতি দ্বারা শোভিত করা বিদআত।

লাইলা অর্থ রাত আর বারাআ অর্থ মুক্তি। সুতরাং লাইলাতুল বারাআ অর্থ মুক্তির রজনী। মোট কথা এ রাতকে লাইলাতুল বারাআত নামে আখ্যায়িত করতে কোনো সমস্যা আছে বলে মনে হয় না যেহেতু বারাআ অর্থ মুক্তি আর এ রাতে আল্লাহ সুবঃ বান্দাদের পাপ থেকে মুক্তি দেন বলে সহীহ সুত্রে প্রমানিত আছে তাছাড়া আলেমরা নামটি ব্যাবহার করেছেন।

এখন শবে বরাত সম্পর্কে কথা হলো। শব শব্দটি ফার্সী যার অর্থ রাত আর বারাআ শব্দটি যদি আরবী শব্দ এর বিকৃতরুপ হয় তবে তার অর্থ মুক্তি ফলে শবে বরাত এর অর্থ লাইলাতুল বারাআ এর সমার্থক হবে। তখন এর অর্থ হবে মুক্তির রজনী যেমনটি আমরা পূর্বেই বলেছি। অনেকে বারআত শব্দটি আরবী শব্দের বিকৃত রুপ হওয়ার সম্ভাবনার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন তাদের যুক্তি হলো যেহেতু প্রথম শব্দটি ফার্সী তাই পরেটিও ফার্সী হতে এটিই স্বাভাবিক। এটার সম্ভাবনা রয়েছে তবে নিশ্চিত নয়। যেহেতু শবে কদর, শবে মেরাজ, ইত্যাদি শব্দের প্রথম অংশ ফার্সী হলেও পরবর্তী অংশ আরবী। সুতরাং সঠিক কথা হলো বারআত শব্দটি আরবী শব্দের বিকৃত রুপও হতে পারে আবার মূল ফার্সী শব্দও হতে পারে। যদি শব্দটি মূল ফার্সী হয় তবে তার অর্থ হবে কোনো কিছু লিপিবব্ধ করার কাগজ, কার্ড ইত্যাদি। এ রাতে ভাগ্য লেখা হয় এ ধারনা থেকেই সম্ভবত এ নামের উদ্ভব হয়ে থাকবে। ঘটনা যাই হোক এতটুকু নিশ্চিত করেই বলা যায় যে বর্তমানে উপমহাদেশের অধিবাসীরা শবে বরাত বলতে ভাগ্যরজনী বুঝে থাকেন। আমরা পূর্বে আলোচনা করেছি যে সঠিক মতে ভাগ্যরজনী হলো লাইলাতুল কদর লাইলাতুল বারাআ নয়। শাবান মাসের মাঝরাতে ভাগ্য লেখা হয় বলে যা কিছু বর্ণিত আছে তা প্রমাণিত নয়।

মোল্লাহ আলী কারী অবশ্য বলেছেন, কোনো সন্দেহ নেই যে, শাবান মাসের মাঝ রাতে ভাগ্য লিখিত হয় যেমনটি হাদীসে স্পষ্টই বলা হয়েছে। তবে মতপার্থক্য হলো উক্ত আয়াতে যে রাতের কথা বলা হয়েছে তা শাবান মাসের মাঝ রাত কিনা। তবে সঠিক মত হলো উক্ত আয়াতে শাবান মাসের মাঝ রাত উদ্দেশ্য নয়। সেক্ষেত্রে কোরআনের আয়াত ও হাদীস হতে এটা প্রমাণিত হবে যে উভয় রাতের সম্মান প্রকাশ করার উদ্দেশ্যে উভয় রাতেই ভাগ্য বন্টিত হয়। এরপর তিনি উভয় রাতে কিভাবে ভাগ্য বন্টিত হয় তার বিভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

এমন সম্ভব যে, শাবান মাসের মাঝ রাতে ঐ দিন হতে কদরের রাত পর্যন্ত সময়ের জন্য ভাগ্য লিপিবদ্ধ করা হয়। এমনও সম্ভব যে, এক রাতে সংক্ষিপ্তভাবে লেখা হয় অন্য রাতে বিস্তারিত লেখা হয় আবার হতে পারে এক রাতে দুনিয়াবী বিষয় লেখা হয় অন্য রাতে আখিরাতের বিষয় লেখা হয় এছাড়াও অন্য অনেক সম্ভাবনার কথা কল্পনা করা যেতে পারে। (মিরকাতুল মাফতীহ)

আমাদের মাযহাবের আলেমরা প্রত্যেকে বলেছেন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ফয়সালা লাইলাতুল কদরেই করা হয় থাকে। এই মতটিই সঠিক এটিই বেশিরভাগ আলেমের মত তবে কোনো কোনো তাফসীরকারক বলেছেন ঐ রাত হলো শাবান মাসের মাঝ রাত। এই মতটি ভুল। (আল মাজমু)
সুতরাং শাবান মাসের মাঝ রাতকে ভাগ্যরজনী মনে করা যাবে না। যেহেতু মানুষ শবে বরাত বলতে ভাগ্যরজনী বুঝে থাকে তাই এ নামটি ব্যবহার করা অনুচিত। তবে এ রাতকে লাইলাতুল বারাআ বলা যেতে পারে। এতে অর্থগত দিক থেকে যেমন সমস্যা পরিলক্ষিত হয় না আবার আলেমরা শব্দটিকে ব্যাবহারও করেছেন। অনেকে বলেন নামটি কোরআন বা হাদীসে উল্লেখ নেই তাই এটি ব্যাবহার করা যাবে না। এ কথা সত্যের উপর প্রতিষ্টিত নয়। কোরআন বা হাদীসে উল্লেখ না থাকলেই কোনো নাম ব্যাবহারের অযোগ্য হয়ে যায় না তাহলে তো বলতে হবে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআ বা সুন্নী বলাও অন্যায়। কিন্তু কোনো সত্যপন্থী আলেম এমন বলেছেন বলে আমি শুনিনি। কোনো নাম ব্যাবহারের ক্ষেত্রে দেখতে হবে সেটির অর্থ ও প্রোয়োগ শরীয়ত সম্মত কিনা। যদি অর্থ ও প্রয়োগ শরীয়ত সম্মত হয় তবে তা ব্যাবহার করা সিদ্ধ হবে। আর আল্লাহই ভাল জানেন।

উপসংহারঃ

ইসলাম সমস্ত প্রকারের বিদআতকে নিষিদ্ধ করে। রসুলুল্লাহ সাঃ বিভিন্ন হাদীসে বিদআত সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। সত্যপন্থী আলেম ওলামারা তাদের যুগের প্রচলিত বিদআত সমূহের নাম উল্লেখ করে মানুষকে সতর্ক করে গেছেন। কিন্তু বর্তমানে কিছু লোক আছেন যারা খুব বেশি পড়াশুনা না করেই কোনো কিছু কে বিদআত বলতে অভ্যস্ত। তাদের মনে রাখতে হবে বিদআত কেবল সেই বিষয়কে বলা যায় শরীয়তে যার কোনো ভিত্তি নেই। কোনো বিষয়ে শরীয়তের দৃষ্টিতে পুরোপুরি অগ্রহনযোগ্য হয় তবে আমি পছন্দ করি আর না করি উক্ত বিষয়কে স্পষ্ট বিদআত বা গোমরাহী বলতে পারবো না। তাই কোনো বিষয় বিদআত এটা বলার পূর্বে উক্ত বিষয়ের উপর প্রচুর লেখা পড়া করার প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ করে যেসব বিষয়ের পক্ষে সত্য পন্থী আলেমদের একটি দলের মত রয়েছে সেটাকে স্পষ্ট বিদআত বলার কোনো অধিকার আমাদের নেই। এসব বিষয়ে অতিরিক্ত কড়াকড়ি করাই বরং নতুন একটি বিদআত। ইমাম ইবনে তাইমিয়ার ভাষ্যনুযায়ী বেশিরভাগ আলেম শবে বরাতের রাতের ফজিলতের স্বপক্ষে। এই রাতে ইবাদত করার বিষয়টি পূর্ববর্তীদের আমলের মাধ্যমে প্রমাণিত। ইমাম শাফেঈ নিজে এ রাতের ফজিলত স্বীকার করেছেন। ইমাম তাইমিয়া বলেছেন ইমাম আহমদের স্পষ্ট কথা দ্বারা এটাই প্রমাণিত হয়। এ বিষয়ে সহীহ সনদে হাদীসও বর্ণিত হয়েছে। এত কিছুর পরও যদি শুধুমাত্র তর্কের খাতিরে আমরা এ রাতের ফজিলতকে অস্বীকার করি আর বিদআতের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার দাবি করি তবে তা কতটুকু সত্য হবে? আল্লাহ আমাদের সকলকে সত্যপথ প্রদর্শন করুন। আমীন………..

শবে বরাত বলা যাবে কিনা

Leave a Reply

Your email address will not be published.