দ্বীন প্রতিষ্ঠার নামে কুফরী মতবাদ বা দ্বীনের দা’ওয়াত বা দ্বীন প্রতিষ্ঠার নামে কুফরী মতবাদ মেনে নেওয়ার বিধান

দ্বীন প্রতিষ্ঠার নামে কুফরী মতবাদ বা দ্বীনের দা’ওয়াত বা দ্বীন প্রতিষ্ঠার নামে কুফরী মতবাদ মেনে নেওয়ার বিধান শায়েখ আব্দুল্লাহ আল মুনীর

বর্তমানে একদল লোক রয়েছে যারা বিভিন্ন কুফরী মতবাদকে কুফরী হিসেবে স্বীকার করে নেওয়ার পরও দ্বীনের দা’ওয়াত ও ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য কৌশল হিসেবে ঐ সকল মতবাদকে পন্থা হিসেবে গ্রহণ করার কথা বলেন। মুসলিমদের নিরাপত্তার স্বার্থে এবং শত্রুকে ক্ষতম করার জন্য কৌশল হিসেবে কুফরীতে লিপ্ত হওয়া বৈধ হওয়া সম্পর্কে আমরা যা কিছু বর্ণনা করেছি তারা এটাকে নিজেদের স্বপক্ষে ব্যবহার করে থাকেন। বিভিন্ন দিক থেকে তাদের এই অপচেষ্টার মূলৎপাটন করা যায়।

১। দ্বীন কোনো দৃশ্যমান বিষয় নয় যে, এটাকে রং-চুন করে রাস্তার পাশে বসিয়ে রাখলেই দ্বীন প্রতিষ্ঠ বলে গণ্য হবে। দ্বীন হচ্ছে কিছু আক্বীদা-বিশ্বাসের উপর টিকে থাকবে। কাফিরদের সকল তিরষ্কার ও হুমকী অগ্রাহ্য করে তারা দ্বীনের উপর অবিচল থাকবে। দ্বীনের দা’ওয়াত বলতেও একই বিষয়কে বোঝায়। দ্বীনের দা’ওয়াত অর্থ কুরআন-হাদীসের যতটুকু সহজ বা যতটুকু সমাজের মানুষ মেনে নেই ততটুকু প্রচার করা নয়। বরং এর অর্থ হলো, অত্যাচারী বাদশার সামনেও সত্য কথা উচ্চারণ করা। সুতরাং কুফরী মতবাদ মেনে নিয়ে কাফিরদের সন্তুষ্ট করে বা কাফিরদের সামনে মাথা নত করে দ্বীন প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয় বরং কাফিরদের মুখের সামনে তাদের ধর্ম ও মতবাদের ত্রুটি-বিচ্যুতি তুলে ধরে এবং তাদের সামনে মাথা উঁচু করে দাড়িয়ে যাওয়ার মাধ্যমেই দ্বীন প্রতিষ্ঠিত হওয়া সম্ভব। কাফিরদের সাথে আপোস করে তাদের কুফরী মতবাদকে বহুলাংশে মেনে নিয়ে এবং তাদের ইচ্ছামত ইসলামের বিধি-বিধানের বিরাট অংশ পরিত্যাগ করে তাদের অনুমতিসাপেক্ষে একটি রাষ্ট্রকে নামকে ওয়াস্তে ইসলামী রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করলেই দ্বীন প্রতিষ্ঠার মহান ব্রত সম্পন্ন হয়ে যায় না। নিজের ঈমান-আক্বীদাকে বিসর্জন দিয়ে সুদভিত্তিক ইসলামী ব্যাংক বা জুয়ার উপর নির্ভরশীল ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স প্রতিষ্ঠা করলেই ইসলামের খেদমত করা হয় না। এসব দুনিয়াবী জৌলুশ ইসলামের কোনো প্রয়োজন নেই। ইসলামের প্রয়োজন এমন একজন ব্যক্তির যে ইসলামকে বক্ষে ধারণ করবে কাফিরদের রাগ আর অভিমানকে পরওয়া না করে বাতিলের মুকাবিলায় আপোসহীনভাবে টিকে থাকবে। এমন একজন ব্যক্তি একাই একটি রাষ্ট্র, সে একাই একটি জাতি।

আল্লাহ্ বলেন, “নিঃসন্দেহে ইব্রাহীম নিজেই একটি জাতি” (সুরা নাহল-১২০)

একপাল গাধার কোনো প্রয়োজন নেই একটি সিংহই যথেষ্ট্য।

সর্বোপরি রাসুলুল্লাহ সাঃ দ্বীন প্রতিষ্ঠা করতেই দুনিয়াতে এসেছিলেন। তিনি যে পদ্ধতিতে দ্বীন প্রতিষ্ঠিত করেছেন সেটিকেই পদ্ধতি হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। তিনি কাফিরদের সমাজে কুফরী আক্বীদা-বিশ্বাসের বিপরীতে ‍ুরুখে দাড়িয়েছেন। তাদের ধর্ম বিশ্বাসের ত্রুটি বিচ্যুতি তুলে ধরেছেন এবং আল্লাহর দ্বীন ইসলামের প্রচার করেছেন। সকল মুসলিমকে এই কর্ম পন্থার উপর দৃঢ়ভাবে টিকে থাকতে আদেশ করেছেন। এই অবস্থায় বাধ্য হওয়ার কারণে দু’একজন সাহাবাকে মুখে কুফরী কথা উচ্চারণের অনুমতি প্রদান করেছেন। বাকী সাহাবায়ে কিরাম দ্বীন প্রতিষ্ঠা ও দ্বীনের দা’ওয়াতের উপর আপোসহীনভাবে টিকে ছিলেন। যখন রাসুলুল্লাহ সাঃ সহ সকল মুসলিমই দ্বীনের উপর অবিচল রয়েছেন এবং বাতিল ধর্ম বিশ্বাসের বিপরীতে অনবরত প্রচারাভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন যেখানে দু’একজন সাহাবী বাধ্য হওয়ার কারণে কুফরীতে লিপ্ত হলে দ্বীনের দা’ওয়াত ও দ্বীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে কোনো ভাটা পড়ে না। তাই বিষয়টির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া যেসব সাহাবায়ে কিরাম বাধ্য হয়ে কুফরী কথা উচ্চারণ করেছেন তারা সারাজীবনের জন্য চিরস্থায়ীভাবে বা সুদীর্ঘ সময়ের জন্য কুফরীতে লিপ্ত হয়েছেন এমন প্রমাণ নেই। বরং তারা পরিস্থিতির দাবী অনুযায়ী সাময়িকভাবে দু’একটি কুফরী কথা উচ্চারণ করেছেন কিছু সময় পরই আবার নিজের স্বাভাবিক জীবন তথা ঈমান ও আমলের পরিবেশে ফিরে এসেছেন। বাধ্য হয়ে ঘটনাক্রমে কুফরীতে লিপ্ত হওয়া আর স্থায়ীভাবে কুফরীর মধ্যে পতিত হওয়ার মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। পূর্বে আমরা ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বাল থেকে বর্ণনা করেছি  যে, তিনি এ বিষয়ে পার্থক্য করেছেন এবং ইবনে কুদামা এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছেন। যে ব্যক্তি স্থায়ীভাবে কুফরীতে লিপ্ত হয় তার অন্তর ক্রমেই কুফরীর প্রতি সহনশীল হয়ে যায়। একইভাবে সমগ্র মুসলিম উম্মাহ্ ঈমানের উপর টিকে থাকা অবস্থায় দু’একজন মুসলিম অনিবার্য কারণে বাহ্যিকভাবে কুফরীতে লিপ্ত হলে ইসলামের মৌলিক দা’ওয়াত অটুট ও অক্ষত থাকে কিন্তু সকল মুসলিমরা কৌশলের নামে একত্রে কুফরী মতবাদের স্বীকৃতি দিলে কুফরীর জন্য ময়দান ফাঁকা হয়ে যায় আর আল্লাহর ধর্ম ইসলাম সম্পূর্ণভাবে পরাজিত হয়। এভাবে নিজেকে স্থায়ীভাবে কুফরীর পঁচা-ডোবায় নিক্ষেপ করা বা ইসলামকে সম্পূর্ণরুপে পরাজিত করে সকলে মিলে একত্রে বাধ্যতার দোহায় দিয়ে কুফরীতে লিপ্ত হওয়া কোনো অবস্থাতেই বৈধ নয়। একারণে আল্লাহ্ তায়ালা হিজরত ও জিহাদ ফরজ করেছেন। যে এলাকাতে ইসলাম পরাজিত নিজের সম্পদ, সন্তান, আত্মীয়-স্বজন ইত্যাদি কোনো কিছু বাধা হিসেবে গণ্য নয়। দুনিয়ার বুকে ইসলামকে বিজয়ী করার জন্য জিহাদ করা ফরজ। এ ব্যাপারে নিজের জীবন, সম্পদ, সন্তান-সন্তুদি ইত্যাদি কোনো কিছুর ক্ষয়-ক্ষতি হলেও তা ওজর হিসেবে গণ্য নয়। মোট কথা দ্বীন প্রতিষ্ঠা বলতে বোঝায় কাফিরদের সাথে আপোসহীন সংগ্রামে লিপ্ত থাকা এবং তাদের বাতিল ধর্মবিশ্বাস ও ভ্রান্ত মতবাদের বিপরীতে বিরামহীন প্রচার প্রসার নিয়োজিত থাকা। রাসুলুল্লাহ সাঃ বলেন,

আমার উম্মাতের মধ্যে একটি দল কিয়ামত পর্যন্ত হকের উপর টিকে থেকে যুদ্ধ করতে থাকবে। (মুসলিম)

আবু দাউদ শরীফের একটি বর্ণনাতে অনুরুপ বলা হয়েছে সেখানে অতিরিক্ত বলা হয়েছে, “এমন কি তাদের এক অংশ দাজ্জালের সাথে যুদ্ধ করবে।”

সুতরাং দ্বীন প্রতিষ্ঠা করা বলতে কাফিরদের সাথে সংগ্রাম করে টিকে থাকা বোঝায়। তাদের মতবাদ মেনে নিয়ে মাথা নত করা নয়। কাফিরদের সাথে সংগ্রামরত অবস্থায় কখনও কখনও বিশেষ প্রয়োজন হেতু দু’একজন মুসলিমকে সাময়িক সময়ের জন্য কুফরী করার অনুমতি দেওয়া যেতে পারে। এধরনের অনুমতির উদ্দেশ্য হয় বাতিলের বিরুদ্ধে মুসলিমদের সংগ্রমকে শক্তিশালী করা এবং বিষয়কে ত্বরান্বিত করা। এ বিষয়ের বৈধতা সম্পর্কেই হাদীস বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত সংগ্রাম ও সংঘর্ষের পথ পরিত্যাগ করে কাফিরদের সাথে আপোসরফা করা এবং তাদের সন্তুষ্ট করার জন্য কুফরী ধর্ম মেনে নিয়ে কৌশলের দোহায় দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। কৌশল হবে সংগ্রামকে শক্তিশালী করার জন্য সংগ্রাম পরিত্যাগ করে দুনিয়ার জীবনে সুখ-শান্তি অর্জন করার জন্য নয়। যুদ্ধে কৌশল করা বৈধ কিন্তু যেখানে যুদ্ধই পরিত্যাগ করা হয়েছে সেখানে কৌশলের দাবী কিভাবে গ্রহণযোগ্য হয়? সুতরাং আল্লাহর দ্বীন রক্ষার তাগিতে কুফরীতে লিপ্ত হওয়ার যে ওজর সেটা এদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। ২। মুসলিম উম্মাহকে কোনো একটি ভয়াবহ ক্ষতি হতে বাঁচানোর তাগিদে বাধ্য হয়ে নিষিদ্ধ কাজে লিপ্ত হওয়ার ক্ষেত্রে শর্ত হলো, যে ক্ষতি থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করা হচ্ছে সেটা বাস্তবে বিদ্যামান থাকতে হবে। কল্পিত কোনো ভয়াবহ বিপদ থেকে মুসলিম উম্মাহকে বাঁচানোর দোহাই দিয়ে কুফরী বা অন্য কোনো নিষিদ্ধ কাজে লিপ্ত হওয়া ওযর যোগ্য নয়। একইভাবে উক্ত নিষিদ্ধ কাজে লিপ্ত হলেই যে, মুসলিমরা উক্ত বিপদ থেকে বেঁচে যাবে সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে। নিছক অনুমানের উপর নির্ভর করে শিরক-কুফরে লিপ্ত হওয়া যাবে না। কা’ব বিন আশরাফ মুসলিমদের মান-সম্মান ও রক্ত-সম্পদের উপর স্পষ্ট হুমকী হয়ে দাড়িয়েছিল এবং তাকে হত্যা করার মাধ্যমে এ থেকে মুসলিমদের মুক্ত করা সম্ভব ছিল তাই দু’একটি কুফরী কথা উচ্চারণ করে হলেও তাকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে যারা কৌশলের কারণে বিভিন্ন নিষিদ্ধ কাজে লিপ্ত হওয়ার মতবাদ প্রচার করে তারা সঠিকভাবে জানেই না আসলে বিপদ কোন জায়গায় এবং তার সমাধান কি। তারা নিছক অনুমান ও খেয়াল-খুশির উপর নির্ভর করে ভয়াবহ বিপদের স্লোগান তুলে সাধারন মুসলিমদের শিরক-কুফরসহ বিভিন্ন নিষিদ্ধ কর্মকান্ডে লিপ্ত করে থাকে। উদাহরণস্বরুপ, বর্তমানে একদল লোক দাবী করে, ইসলামপন্থীরা ভোটে না জিতলে সাধারন মুসলিমরা ঈমান নিয়ে বেঁচে থাকতে পারবে না। তাই এখন কুফরী সংবিধানের অধীনে হলেও ভোট যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে মুসলিমরা বাধ্য। অথচ বাস্তবে দেখা যায় ভোটে কথিত ইসলামপন্থীরাই জয়ী হোক অথবা বামপন্থীরা মুসলিমদের জন্য পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন ঘটেনা। ভোটে জয়ী হওয়ার পরও ইসলামপন্থী এম,পি মন্ত্রীরা নাচ-গানের আসরে গমণ করেন, মন্দির প্রদর্শনে ভ্রমণ করেন আর বলেন, আমরা এগুলো করতে বাধ্য। যদি ভোটে জয়ী হওয়ার পরও কেউ নিষিদ্ধ কাজে বাধ্য হয় তবে সে ধরণের বিজয় অর্জন করে মুসলিমদের সমস্যার কি সমাধান হলো সেটাই এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এই ধরণের বিজয় অর্জনের জন্য কুফরী সংবিধানের অধীনে নির্বাচন করা একটি অপরাধ এবং এই বিজয় ধরে রাখার জন্য ইসলামপন্থী এম,পি মন্ত্রীদের গান-বাজনার আসরে বা মন্দিরে গমণ করা আরেকটি অপরাধ এই সকল অপরাধের কোনটিই ওজরযোগ্য নয়।

দ্বীন প্রতিষ্ঠার নামে কুফরী মতবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published.