তাওহীদে অজ্ঞ ব্যক্তির বিধান বা তাওহীদ ও রেসালাতের উপর যে বিশ্বাস স্থাপন করেনি সে অজ্ঞ হলেও দুনিয়ার বিধানে কাফির হিসেবে গণ্য হবে।

তাওহীদে অজ্ঞ ব্যক্তির বিধান বা তাওহীদ ও রেসালাতের উপর যে বিশ্বাস স্থাপন করেনি সে অজ্ঞ হলেও দুনিয়ার বিধানে কাফির হিসেবে গণ্য হবে। শায়েখ আব্দুল্লাহ আল মুনীর

এই গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়ে আমরা একজন ব্যক্তি কিভাবে মুসলিম হিসেবে গণ্য হয় সে সম্পর্কে আলোচনা করেছি। সেখানে আমরা দেখেছি, একজন প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষ বা নারী কেবলমাত্র তখন মুসলিম হিসেবে গণ্য হবে যখন সে তাওহীদ ও রেসালাতের স্বীকৃতি দেবে। না-বালেগ শিশুর জন্মসূত্রে বা মুসলিমদের হাতে যুদ্ধে বন্দি হওয়ার মাধ্যমে মুসলিম হিসেবে গণ্য হয়। কিন্তু বালেগ হওয়ার পর যদি যারা তাওহীদ ও রেসালাতের স্বীকৃতি হতে সরে আসে তবে তারা কাফির হিসেবে গণ্য হবে। অতএব, সাধারনভাবে বলা যায় তাওহীদ ও রেসালাতের স্বীকৃতি দেওয়া ছাড়া একজন ব্যক্তি মুসলিম হিসেবে গণ্য হতে পারে না। রাসুলুল্লাহ সাঃ বলেন, আমাকে আদেশ করা হয়েছে মানুষের সাথে যুদ্ধ করার জন্য যতক্ষন না তারা সাক্ষ্য দেয় আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই আর আমার উপর ও আমি যা কিছু নিয়ে এসেছি তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করে। মুখে কি বাক্য উচ্চারণ করলে একজন ব্যক্তি মুসলিম হবে সে ব্যাপারে আলেমদের কিছু দ্বিমত রয়েছে কিন্তু মুসলিম হতে হলে আল্লাহর একত্ববাদ ও রাসুলুল্লাহ সাঃ এর রেসালাতের উপর বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে এ বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই। যে ব্যক্তি আল্লাহর একত্ববাদ এবং রাসুলুল্লাহ সাঃ আল্লাহর পক্ষ থেকে যে সত্য দ্বীন আনয়ন করেছেন তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করে না সে মুসলিম নয়। যদি এই ব্যক্তি পৃথিবীর কোনো সুদূর প্রান্তে অবস্থান করার কারণে রাসুলুল্লাহ সাঃ এর আগমন সম্পর্কে জানতে না পারে তবে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার সাথে কি আচরণ করবেন সে সম্পর্কে আলেমদের মাঝে দ্বিমত আছে।  কেউ কেউ বলেছেন সে মুক্তি পাবে যেহেতু আল্লাহ তায়ালা বলেন, “রাসুল প্রেরণ না করে আমি কাউকে শাস্তি দিই না।” অন্য আরেকদল আলেম বলেছেন, কমপক্ষে আল্লাহর একত্ববাদ সম্পর্কে বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে যেহেতু আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি কৌশল পর্যবেক্ষণ করে আল্লাহর একত্ববাদ সম্পর্কে বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে যেহেতু আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি কৌশল পর্যবেক্ষণ করে আল্লাহর একত্ববাদ সম্পর্কে ধারনা পাওয়া সম্ভব। অন্য আরেকদল আলেম বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা কিয়ামতের দিন তাদের পরীক্ষা নেবেন। সেই পরীক্ষায় যারা সফল হবে তারা মুক্তি পাবে আর যারা ব্যার্থ হবে তারা ধ্বংস হবে। এই সকল মতামতের প্রতিটির স্বপক্ষে বেশ কিছু আলেমের সমর্থন রয়েছে তারা নিজেদের মতের স্বপক্ষে কুরআন-হাদীস হতে বিভিন্ন দলিল প্রমাণ পেশ করেছেন। এই গ্রন্থে আমরা এ বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা করতে চাই না যেহেতু বিষয়টি আখিরাতের সাথে সংশ্লিষ্ট, দুনিয়ার বিধানের সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই। এখানে গুরুত্বপূর্ণ হলো, যার নিকট ইসলামের দা’ওয়াত পৌছায় নি দুনিয়াতে তাকে কাফির হিসেবেই গণ্য করা হবে। জানাযার সলাত, মিরাছ, বিবাহ, পশু যবেহ করা ইত্যাদি যাবতীয় বিধি-বিধানে উক্ত কাফির হিসেবেই গণ্য হবে। যদি ধরে নেওয়া হয় পৃথিবীতে এমন একটি এলাকা রয়েছে যেখানে ইসলাম গ্রহণ করে। পরবর্তীতে তার আত্মীয়-স্বজনকে দ্বীনের দাওয়াত দেওয়ার জন্য সে কিছু মুসলিমকে সাথে নিয়ে নিজ এলাকায় ফিরে যায়। সেখানে পৌছানোর পর দেখা গেল উক্ত ব্যক্তির বাবা মৃত্যুবরণ করেছে। এখন বিধান হলো, ঐ ব্যক্তির জানাযার সলাত পড়া যাবে না এবং এই মুসলিম সন্তানটি তার পিতার সম্পত্তিতে অংশ পাবে না। এভাবে দুনিয়ার যাবতীয় বিধানে ঐ সকল লোকদের কাফির হিসেবে গণ্য করা হবে এ বিষয়ে আলেমদের মাঝে কোনো দ্বিমত নেই। পূর্বে কাফিরদের সন্তানকে দুনিয়ার বিধানে কাফির হিসেবে গণ্য করার ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা গত হয়েছে।

রসুলুল্লাহ সাঃ কাফিরদের সন্তান সম্পর্কে বলেন, “ওরা ওদের মধ্যেই অন্তর্ভূক্ত”। কোনো কোনো রেওয়ায়েতে এসেছে “তারা তাদের পিতাদের সাথেই”। (মুত্তাফাকুন আলাইহি)

ইমাম নাব্বী রঃ হাদীসটির ব্যাখ্যায় বলেন, উত্তরাধিকার, বিবাহ, কিসাস, রক্তমূল্য ইত্যাদি ব্যাপারে তাদের পিতাদের বিধান অনুসারে তাদের বিবেচনা করা হবে। (শারহে মুসলিম)

কাফিরদের সন্তানদের কাফির হিসেবে গণ্য করার বিষয়টি স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, ইসলাম গ্রহন করেনি এমন প্রতিটি ব্যক্তিকে দুনিয়ার বিধানে কাফির হিসেবে গণ্য করা হবে যদিও তার নিকট ইসলামের দাওয়াত না পৌছিয়ে থাকে। যখন পিতা-মাতার কুফরীর কারণে ছোট শিশুদের ‍দুনিয়ার বিধানে কাফির হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে তখন যারা নিজেরাই কুফরীতে লিপ্ত হয়েছে অজ্ঞতার ওযর থাকলেও তারা দুনিয়ার বিধানে কাফির হওয়া থেকে বাঁচতে পারবে না এটাই স্বাভাবিক। একারণে সকল ওলামায়ে কিরাম এ ব্যাপারে একমত হয়েছেন। আখিরাতের বিধানে তাদের সাথে কিরুপ আচরণ করা হবে সে বিষয়ে দ্বিমত থাকলেও দুনিয়ার বিধানে তাদের কাফির হিসেবে গণ্য করার ব্যাপারে কোনো দ্বিমত নেই। ব্যাতিক্রম কেবল এতটুকু যে, যার নিকট ইসলামের দা’ওয়াত পৌছায়নি তাকে ইসলামের দা’ওয়াত দেওয়ার পূর্বে হত্যা করা নিষিদ্ধ হয় যেমন, কাফির নারী ও শিশুরা এবং জিম্মী কাফিররা। এই সকল শ্রেনীর লোকেরা কাফির হওয়া হত্ত্বেও তাদের হত্যা করা নিষেধ। তবে কোনো মুসলিম হত্যা করা যাবে না। যেহেতু রাসুলুল্লাহ সাঃ বলেন, “কোনো মুসলিমকে কোনো কাফিরের বিনিময়ে হত্যা করা যাবে না”। (সহীহ বুখারী)

যার নিকট ইসলামের দা’ওয়াত পৌছায়নি এমন কাফিরের ক্ষেত্রেও একই বিধান প্রযোজ্য। অর্থাৎ তাকে হত্যা করা নিষিদ্ধ হলেও যদি কোনো মুসলিম তাকে হত্যা করে তবে সে অপরাধী হবে কিন্তু কিসাস হিসেবে তাকে হত্যা করা যাবে না।

ইমাম মুহাম্মাদ রঃ সিয়ারে কাবীরে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। দা’ওয়াত পাওয়ার পূর্বেই কোনো কাফিরকে হত্যা করা হলে তার বিধান সম্পর্কে তিনি বলেন, তাদের মধ্যে যে কাউকে হত্যা করা হলে আমাদের মতে তার রক্তপাত প্রদান করা হবে না। (সিয়ারে কাবীর)

এরপর তিনি ইমাম শাফেঈ থেকে উল্লেখ করেন, তিনি তার রক্তমূল্য প্রদান করার মত প্রদান করেছেন। মোট কথা উক্ত ব্যক্তির রক্তমূল্য আদায় করতে হবে কিনা সে বিষয়ে আলেমরা দ্বিমত করেছেন কিন্তু তারা কেউই এখানে কিসাস তথা হত্যার বিনিময়ে হত্যার কথা বলেননি।

শাফেঈ মাজহাবের বিভিন্ন ফিকাহ্ গ্রন্থে কাফিরের বিনিময়ে মুসলিমকে হত্যা করা হবে না এ সম্পর্কিত আলোচনাতে বলা হয়েছে, এখানে কাফির বলতে উদ্দেশ্য হলো, মুসলিম ছাড়া যে কেউ এমন কি যার নিকট ইসলামের দাওয়াত পৌছায় নি সেও এর মধ্যে অন্তর্ভূক্ত। কেননা যদিও সে আখিরাতের বিধানের মতো (মুক্তি পাবে) কিন্তু দুনিয়ার বিধানে তেমন নয়। (তুহফাতুল মুহতাজ ও অন্যান্য)

ইমাম নাব্বী রঃ বলেন, অনেক সময় এমন হয় যে, কোনো ব্যক্তি আখিরাতে মুক্তি পাবে বলা হচ্ছে কিন্তু দুনিয়ার বিধানে তাকে মুসলিম বলে গণ্য করা হবে না। যার নিকট দাওয়াত পৌছায়নি তার বিষয়টি এমন। (রওদাতুত তালেবীন)

হাম্বালী মাযহাবের প্রখ্যাত ফকীহ্ ইবনে কুদামা রঃ বলেন, যদি এমন লোক থাকে যার নিকট দাওয়াত পৌছায় নি তবে তাকে দাওয়াত দেওয়ার পূর্বে হত্যা করা যাবে না। কিন্তু যদি (কোনো মুসলিম) তাকে দাওয়াত দেওয়ার পূর্বেই হত্যা করে ফেলে এবং তার সাথে কোনো চুক্তি না থাকে এ জন্য রক্তমূল্য দেওয়া লাগবে না। যেহেতু তার সাথে কোনো নিরাপত্তা চুক্তি নেই। তার বিষয়টি কাফিরদের নারী ও শিশুদের মতো (অর্থাৎ তাদের হত্যা করা নিষিদ্ধ কিন্তু হত্যা করে ফেললে কোনো রক্তমূল্য আবশ্যক হয় না। (আল-মুগনী)

উপরোক্ত বিশ্লেষণ সাপেক্ষ এটা স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে, তাওহীদ ও রেসালাতের স্বীকৃতি দেওয়া ছাড়া কেউ মুসলিম হিসেবে গণ্য হবে না। এ বিষয়ে অজ্ঞতা ওযর হিসেবে কাজ করবে না। তাওহীদের স্বীকৃতি বলতে বোঝায় এক আল্লাহতে বিশ্বাস স্থাপন করা এবং আল্লাহ ছাড়া সকল উপাস্যকে পরিত্যাগ করা। আর রেসালাতের স্বীকৃতি বলতে দুটি বিষয়কে বোঝায়। মুহাম্মদ সাঃ কে আল্লাহর রসুল হিসেবে মেনে নেওয়া এবং তিনি আল্লাহর নিকট হতে যা কিছু নিয়ে এসেছেন তা সত্য হিসেবে বিশ্বাস করা। রাসুলুল্লাহ সাঃ এ বিষয়টিকে সংক্ষেপে বর্ণনা করেছেন এভাবে “এবং আমার উপর আর আমি যা কিছু নিয়ে এসেছি তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে।” (সহীহ্ মুসলিম)

একজন ব্যক্তির মুসলিম হওয়ার জন্য কুরআন-হাদীসে কিকি বিধান আছে তা বিস্তারিত জানা শর্ত নয় তবে এতটুকু বিশ্বাস অবশ্যই রাখতে হবে যে, পবিত্র কুরআন এবং সহীহ্ হাদীসে যা কিছু বলা হয়েছে সেটিই আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ সত্য দ্বীন। এটাই স্বাভাবিক যে, এই ঘোষণা দেওয়ার সময় ইসলামের সকল বিধি-বিধান সম্পর্কে সে জানবে না। কিন্তু ইসলাম গ্রহণের পর সে ক্রমে ক্রমে ইসলামের বিভিন্ন বিধান সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করবে। সেক্ষেত্রে ইসলামের যে বিধানটি সম্পর্কেই সে জানতে পারবে তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে। ইসলামের বিধি-বিধান সম্পর্কে সুবিস্তারে জানা বেশিরভাগ লোকের পক্ষেই সম্ভব নয়। এমনকি আলেম-ওলামাদের পক্ষেও সকল বিষয়ে বিদ্যান হওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না। ইসলামের মৌলিক বিধি-বিধান যেমন, সলাত-সওম, হজ্জ-যাকাত ইত্যাদি ফরজ ইবাদত এবং মদ-জুয়া, সুদ-ঘুষ ইত্যাদি হারাম কাজ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করতেও একজন ব্যক্তির বেশ কিছু কাল সময় লেগে যাওয়াই স্বভাবিক। একারণে যে ব্যক্তি আল্লাহ-রাসুল ও কুরআন-হাদীসে বিশ্বাস স্থাপণ করে তথা ইসলাম গ্রহণ করে কিন্তু ইসলামের কোনো একটি বিধান অস্বীকার করে তার ক্ষেত্রে আলেমরা অজ্ঞতাকে ওযর হিসেবে গণ্য করেছেন। যে তাওহীদ ও রেসালাতকে স্বীকার করেনি তথা আদৌ ইসলাম গ্রহণ করে নি তার ক্ষেত্রে আলেমরা অজ্ঞতাকে ওযর হিসেবে গণ্য করেছেন। যে তাওহীদ ও রেসালাতকে স্বীকার করেনি তথা আদৌ ইসলাম গ্রহণ করেনি তার ক্ষেত্রে অজ্ঞতাকে ওযর হিসেবে গণ্য করা যাবে না।

তাওহীদে অজ্ঞ ব্যক্তির বিধান তাওহীদে অজ্ঞ ব্যক্তির বিধান তাওহীদে অজ্ঞ ব্যক্তির বিধান

Leave a Reply

Your email address will not be published.