ঈদে মিলাদুন্নবী এর বিধান – শায়েখ আব্দুল্লাহ আল-মূনীর

ঈদে মিলাদুন্নবী এর বিধান – শায়েখ আব্দুল্লাহ আল-মূনীর এর প্রবন্ধটি পড়া শেষ হলে শেয়ার করতে ভূলবেন না।

বর্তমান যুগে যেসব বিষয়কে বিদয়াত হিসেবে আখ্যায়িত করে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা ও ফিতনা-ফসাদ সৃষ্টি করা হয় তার মধ্যে ঈদে মিলাদুন্নবী অন্যতম। যারা বিদয়াত নিয়ে আলোচনা করেন তাদের বেশিরভাগ অংশই সর্বাগ্রে ঈদে মিলাদুন্নবী কে বিদয়াতের জ্বলজ্যান্ত উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন। ‘ঈদ’ শব্দটির সরল অর্থ হলো ’বাৎসরিক উৎসব’ আর মীলাদ অর্থ জন্মের সময় বা জন্মদিন। সুতরাং ঈদে মিলাদুন্নবী অর্থ হলো আল্লাহর রাসুলের জন্মদিন উপলক্ষে বাৎসরিক ভাবে উৎসব করা। আল্লাহর রাসুলের দুনিয়াতে আগমণের বিষয়টি যে একটি খুশির সংবাদ সে ব্যাপারে কেউই সন্দেহ করতে পারে না। সুতরাং এই খুশিতে কিছু আনন্দ উৎসব (অবশ্যই তা বৈধ পন্থায়) করা হলে তা কোনো বিদয়ত হবে সেটা স্বাভাবিক বিবেক বুদ্ধি সম্পন্ন যে কারও নিকট গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আল্লাহর রাসুল দুনিয়াতে আগমণ করেছিলেন একারণে খুশি হয়ে আনন্দ প্রকাশ করা পাপের কাজ হবে এমন উদ্ভট কথা সাধারন বিচার-বুদ্ধি সম্পন্ন লোকেরা মেনে নিতে প্রস্তুত নয়। সম্ভবত একারণেই অনবরত ফতোয়াবাজীর পরও আল্লাহর ইচ্ছায় বেশিরভাগ মুসলিম আজ পর্যন্ত রাসুলের জন্মদিবসে উৎসবের আয়োজন করে থাকে। সকল প্রসংশা আল্লাহর।

যারা বিষয়টিকে অপছন্দ করেন তারা বেশ কিছু যুক্তি উপস্থাপণ করে থাকেন। এখানে তাদের যুক্তিগুলো পর্যায়ক্রমে উল্লেখ করে সদুত্তর প্রদানের চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ।

ক।      আল্লাহর রাসুলের জন্মদিবস পাল করার বিপক্ষে মৌলিকভাবে যে যুক্তিটি উপস্থাপণ করা হয় তা হলো আল্লাহর রাসুল নিজে বা তার সাহাবায়ে কিরাম এটা পালন করেন নি। যদি এটা ভাল কিছু হতো তবে তারা অবশ্যই তা পালন করতেন। আমরা কি রাসুলকে সাহাবায়ে কিরামের চেয়ে অধিক ভালবাসি! এসব যুক্তি অনেকের নিকট খুবই চমকপ্রদ মনে হয়। সাধারনত ইসলাম সম্পর্কে কম জ্ঞান রাখে এমন ব্যক্তিরাই এসব যুক্তিতে অধিক বিভ্রান্ত হয়। পূর্বে আমরা যা কিছু আলোচনা করেছি তার আলোকে এই যুক্তিটির অসারতা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়। আমরা দেখেছি রাসুলুল্লাহ সাঃ বা তার সাহাবায়ে কিরাম কোনো কাজ করেন নি এর অর্থ এই নয় যে কাজটি হারাম বা নিষিদ্ধ। যেহেতু অনেক সময় রাসুলুল্লাহ সাঃ উত্তম কাজও পরিত্যাগ করতেন। তাছাড়া আল্লাহর রাসুল বা সাহাবায়ে কিরাম করেননি এমন বহু বিষয় পরবর্তীতে মুসলিম উম্মাহ ঐক্যমতের মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য সাব্যস্ত করেছেন যেসব বিষয়ের উদাহরণ আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি। এসব দলিল-প্রমাণেল কারণে মুসলিম উম্মাহর ওলামায়ে দ্বীনের নিকট সঠিক রায় হলো, রাসুলের যুগে ছিল না বা সাহাবায়ে কিরামের যুগে ছিল না কেবল এই যুক্তিতে যে কোনো বিষয়কে নিন্দা করা যাবে না বরং দেখতে হবে বিষয়টি শরীয়তের মূলনীতিতে গ্রহনীয় নাকি বর্জনীয়। এই মূলনীতির আলোকে চিন্তা করলে আমরা দেখবো আল্লাহর রাসুলের জন্মোৎসব পালন করা শরীয়তের দৃষ্টিতে অতি উত্তম একটি আমল যার বিরোধিতা করা মারাত্নক অন্যায়। প্রথমত রাসুল সাঃ এর জন্ম আল্লাহর পক্ষ হতে একটি বিশেষ অনুগ্রহ ও দয়া। যেহেতু আল্লাহ তাকে সমগ্র মানবতার পথপ্রদর্শক ও মুক্তির আলোকবার্তিকা হিসেবে প্রেরণ করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, আমি তো আপনাকে জগৎবাসীর জন্য রহমত স্বরুপ প্রেরণ করেছি। (সুরা আম্বিয়া -১০৭)

আর আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়া পাওয়ার পর খুশি হওয়া একটি সৎ স্বভাব। স্বয়ং আল্লাহর রব্বুল আলামীন তার দয়া ও অনুগ্রহ প্রাপ্তির পর খুশি হওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলেন,

হে নবী আপনি বলুন এটা (কুরআন অবতীর্ণ, হেদায়েত পাওয়া ইত্যাদি বিষয়) আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ অনুগ্রহ ও দয়া। অতএব তারা একারণে আনন্দিত হোক। (সুরা ইউনুস-৫৮)

সুতরাং, একথা বলার অধিকার কারো নেই যে, আমি রাসুলের জন্ম গ্রহণে খুশি হয় নি। এটা যে বলে তার ইমান-আক্বীদা সুরক্ষিত নয়। এমনটি কেউ বলেও না। এখানে কিছু লোকের বক্তব্য হলো আনন্দ করতে দোষ নেই তবে সেটা হতে হবে রাসুলুল্লাহ সাঃ এবং সাহাবায়ে কিরামের দেখানো পথে। যে পদ্ধতিতে তারা উৎসব করেন নি সে পদ্ধতিতে উৎসব করা যাবে না। উদাহরণস্বরুপ তারা বলেন, রাসুলুল্লাহ সাঃ সোমবার দিন জন্মগ্রহণ করেছিলেন একারণে তিনি সেদিন সওম পালন করার কথা বলেছেন অতএব কেউ যদি রাসুলের জন্মদিন পালন করতে চায় তবে সওম পালন করুক। বাহ্যিক দৃষ্টিতে এই উক্তিটি সঠিক মনে হলেও এখানে একটি বড় ধরণের ফাঁক রয়েছে। প্রকৃত কথা হলো, আনন্দ প্রকাশ করা যদি বৈধ হয় তবে যে যার ইচ্ছা মত যে কোনো বৈধ পন্থায় আনন্দ প্রকাশ করার অধিকার পাবে এটিই স্বাভাবিক। উদাহরণস্বরুপ শরীয়তে দুই ঈদের দিন আনন্দ প্রকাশ করার বিধান রয়েছে। সাহাবায়ে কিরাম কেউ দফ(এক ধরনের বাদক) বাজিয়ে, কেউ তীর নিক্ষেপের প্রতিযোগীতা করে আনন্দ প্রকাশ করেছেন বলে প্রমাণ আছে। তারা এভাবে আনন্দ প্রকাশের পূর্বে রাসুলের নিকট অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন নি। তবে রাসুল সাঃ তাদের এসব কাজকে নিন্দ করেন নি।  এখন মুসলিমরা বিভিন্নভাবে ঈদের আনন্দ উপভোগ করে থাকেন। বন্ধু-বান্ধবদের দা’ওয়াত দেওয়া, তাদের বাসায় বেড়াতে যাওয়া, মোটর সাইকেল বা অন্য কোনো যানবাহনে দলবদ্ধভাবে ভ্রমণে বের হওয়া, পরিবার পরিজনকে সাথে নিয়ে আনন্দ উপভোগ করার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে ভ্রমণ করে বাড়ি ফিরে আসা ইত্যাদি। সাহাবায়ে কিরাম বিশেষভাবে ঈদ উপলক্ষে মানুষকে দা’ওয়াত করে খাইয়েছেন বা প্রমোদ ভ্রমণ করেছেন এমন প্রমাণ যদি না-ই পাওয়া যায় তবু কি এগুলো বিদয়াত হিসেবে আখ্যায়িত হবে? বিয়ের অনুষ্ঠানে শরীয়তের সীমার মধ্যে অবস্থান করে আনন্দ-ফূর্তি করার ব্যাপারে শরীয়তে উৎসাহিত করা হয়েছে। এর অর্থ কি এই যে হুবহু যেভাবে সাহাবায়ে কিরামের যুগে বিবাহ অনুষ্ঠান পালন করা হতো সেভাবে পালন করতে হবে নাকি শরীয়তের সীমার মধ্যে অবস্থান করে যে কোনো বৈধ পন্থায় তা করা যায়? উদাহরণস্বরুপ আমাদের দেশে বিয়ে উপলক্ষে গেট সাজানো হয়, বাসর সাজানো হয়, গাড়ি বহর নিয়ে বরযাত্রী আসে ইত্যাদি। হুবহু এই ভাবে সাহাবায়ে কিরাম বিবাহ অনুষ্ঠান করেছেন বলে প্রমাণিত নেই। তাহলে কি এগুলো বিদয়াত হবে?

প্রকৃত সত্য হলো, যদি প্রতিটি পদে পদে এভাবে মানুষকে বিদয়াতের ভয় দেখানো হয় তবে তারা আনন্দিত হওয়ার চেয়ে আতংকিত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। আনন্দ প্রকাশের অর্থই হলো নিজের মনের ভাব মোটামুটি স্বাভীনভাবে প্রকাশ করা। বিশ্বের প্রতিটি দেশ ও জাতির নিজস্ব কিছু রসম-রেওয়াজ ও কৃষ্টি-কালচার রয়েছে। তারা সেগুলোর উপর নির্ভর করে আনন্দ-ভুর্তি প্রকাশ করে থাকে। যদি তার মধ্যে হারাম কিছু থাকে তবে তা থেকে তাদের নিষেধ করা হবে তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু যেগুলো হারাম নয় যদি সেগুলো থেকেও নিষেধ করা হয় তবে সেটা কখনও আনন্দ প্রকাশ বলে গণ্য হতে পারে ন। আল্লাহর রাসুলের জন্ম দিবস উপলক্ষে আনন্দ প্রকাশের বিষয়টি কিছুমাত্র ব্যতিক্রম নয়। আনন্দ মিছিল, সীরাত মাহফিল, হামদ-নাত, সভা-সমাবেশ ইত্যাদি যে কোনো বৈধ পন্থায় এটা পালন করাতে দোষের কিছু নেই। উপরে উল্লেখিত একটি হাদীস এ বিষয়ে শিক্ষণীয়। আমরা দেখেছি, কোনো এক যুদ্ধ থেকে রাসুলুল্লাহ সাঃ নিরাপদে বিজয়ী অবস্থায় প্রত্যাবর্তন করলে একজন মহিলা সাহাবী নিয়ত করেন তার সামনে দফ বাজিয়ে গান করে আনন্দ প্রকাশ করবেন। রাসুলুল্লাহ সাঃ দফ বাজিয়ে গান করার বিষয়টি অপছন্দ করা স্বত্ত্বেও যেহেতু বিষয়টি বৈধ তাই এটা অনুমতি দেন। এখানে আনন্দ প্রকাশের মাধ্যম কি হবে তা কিন্তু উক্ত মহিলা সাহাবী নিজেই ঠিক করে নিয়েছিলেন। আপনাদের কি মনে হয়, যদি তিনি কুরআন তেলোয়াত, দোয়া-দরুদ পাঠ ইত্যাদি পদ্ধতি অবলম্বন করতেন তবে কি রাসুলুল্লাহ সাঃ তাকে নিষেধ করতেন? স্বাভাবিক বুদ্ধির যে কারও নিকট এটা স্পষ্ট যে তিনি তাকে নিষেধ করতেন না। সুতরাং আল্লাহর রাসুলের আগমণ উপলক্ষে খুশি হয়ে যে কোনো বৈধ পন্থায় আনন্দ প্রকাশ করা হতে নিষেধ করার আদৌ কোনো কারণ নেই। বরং এটা অত্যাধিক ফজিলত পূর্ণ কাজ হবে তা নিৎসন্দেহে বলা যায়। সহীহ সূত্রে বর্ণিত আছে আবু লাহাব রাসুলুল্লাহ সাঃ এর জন্ম উপলক্ষে খুশি হয়ে একটি দাসী মুক্ত করে। পরবর্তীতে তার পরিবারের কেউ স্বপ্ন দেখে যে একারণে আল্লাহ তাকে জাহান্নামের মধ্যে সামান্য পরিমাণ পানি পান করার সুযোগ দেন। এটা একটি স্বপ্ন যা ভুলও হতে পারে ঠিকও হতে পারে কিন্তু আল্লাহর রাসুলের জন্ম উপলক্ষে কোনো মুসলিম যদি খুশি হয় তবে তার ব্যাপারে সুউচ্চ সম্মান লাভের সম্ভাবনা নিৎসন্দেহে সঠিক। একারণে ইমাম সুয়ূতী এই হাদিসটিকে রাসুলের জন্ম দিন পালন করার স্বপক্ষে প্রমাণ হিসেবে গণ্য করেছেন। আর আল্লাহই ভাল জানেন।

খ।       এখানে আরেকটি সংশয় প্রচলিত আছে। কেউ কেউ বলে, রাসুলের জন্মদিন ১২ই রবিউল আওয়াল কিনা সেটা তো নিশ্চিত নয় বরং বহু সংখ্যক আলেমের মতে অধিক সঠিক মত হলো ৮ তারিখ বা ৯ তারিখ। সুতরাং ১২ তারিখ রাসুলের জন্ম দিন পালন করা কিভাবে সঠিক হয়। কেউ কেউ আবার বিষয়টিকে অধিক শক্ত করার জন্য বলে, বর্তমানে জ্যোতির্বিদ্যার উপর অভিজ্ঞ কোনো কোনো পন্ডিত গবেষণা করে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছেন যে, রাসুলের জন্ম রবিউল আওয়াল মাসের ১২ তারিখে হতে পারে না। সুতরাং পূর্বে এ বিষয়ে কিছু দ্বিতমত থাকলেও এখন আর দ্বিমত করার সুযেগ নেই। এর সাথে কেউ কেউ এটাও যোগ করে যে, ১২ই রবিউল আওয়ালে তো রাসুল সাঃ মৃত্যুবরণ করেন বলে বর্ণিত আছে সুতরাং ঐ দিন আনন্দ-উৎসব করলে তো রাসুলের মৃত্যুতে আনন্দ প্রকাশ করা হয়।

এই সকল প্রশ্নের উত্তরে আমরা বলবো, রাসুলুল্লাহ সাঃ বলেন,“নিঃসন্দেহে নিয়ত অনুযায়ী কাজের বিচার হবে।” যারা ১২ ই রবিউল আওয়াল এ আনন্দ উৎসব করে তারা রাসুলের জন্ম উপলক্ষে আনন্দ প্রকাশ করে নাকি তার মৃত্যু উপলক্ষে সেটা খুবই স্পষ্ট। আল্লাহ তাদের নিয়ত সম্পর্কে অবহিত এবং সে অনুযায়ীই তাদের বিচার করবেন। ১২ ই রবিউল আওয়ালে প্রকৃতই রাসুলের জন্ম হয়েছিল কিনা সেটা এখানে কেনো সমস্যা হিসেবে গণ্য নয়। বিভিন্ন হাদীসে ২৭ শে রমজান কদরের রাত হওয়ার অধিক সম্ভাবনা রাখে এমন বলা হয়েছে এবং কদর রাত যারা তালাশ করে তাদের বিশেষভাবে ২৭ তারিখ ইবাদত বন্দেগী করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এখন যদি কেউ ব্যাস্তথা বা অন্য কোনো কারণে পুরো রমজান মাস বা রমজান মাসের শেষ দশকে অতিরিক্ত ইবাদত বন্দেগী না করে কেবল ২৭ তারিখে ইবাদত বন্দেগী করে আর ঘটনাক্রমে ঐ দিন শবে কদর না হয় তবে কি এই ব্যক্তি গোনাহগার হবে! এ প্রশ্নের সহজ উত্তর হলো ঐ ব্যক্তি যদি শবে কদরের সওয়াব থেকে বঞ্চিত হয় তবু শবে কদর তালাশ করার কারণে আল্লাহ তাকে পুরস্কৃত করবেন। রাসুলের জন্ম দিন সম্পর্কে আলেমরা মতপার্থক্য করেছেন। ৮, ৯, ১২ ইত্যাদি দিনগুলোর মধ্যে কোনটি যে রাসুলের জন্ম দিন সেটা নিঃশ্চিত করে বলা যায় না। এ মতপার্থক্য কিয়ামত পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। দু একজন পন্ডিত এখন জ্যোতির্বিদ্যার উপর গবেষণা করে একটা রায় দিলেই পুরো মুসলিম উম্মহ তা মেনে নিতে বাধ্য থাকবে এমন কখনও নয়। এ ধরণের দাবী করা স্পষ্ট বোকামী ছাড়া কিছু নয়। অতএব, যে ব্যক্তি রাসুলের জন্ম দিন মনে করে ১২ তারিখে আনন্দ প্রকাশ করে যদি ঐ দিন রাসুলের জন্ম দিন হয় তবে তো উত্তম আর যদি তা না হয় তবু এই ব্যক্তি নুন্যতম কল্যান থেকে বঞ্চিত হবে না। রাসুলুল্লাহ সাঃ বলেছেন, যখন কেউ ইজতিহাদ করে এবং তার রায় সঠিক হয় তার দুটি সওয়াব হয় আর যদি তার রায় ভুল হয় তবে তার একটি সওয়াব হয়।

কেউ কেউ বলে, রাসুলুল্লাহ সাঃ ১২ ই রবিউল আওয়ালে জন্ম গ্রহণ করেছেন কিনা এ বিষয়ে দ্বিমত থাকলেও ঐ দিন তিনি যে মৃত্যুবরণ করেছেন এ বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই। একথা অজ্ঞ লোকেরা বলে। সত্য কথা হলো রাসুলুল্লাহ সাঃ এর জন্ম দিন সম্পর্কে যেমন দ্বিমত রয়েছে তার ওফাতের দিন সম্পর্কেও দ্বিমত রয়েছে। আস-সুহাইলি তার সীরাত গ্রন্থ আর – রাওদ আল – উনুফ এ বিসয়টি প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন। এসব বিষয়ে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করতে চায় না। আমাদের কথা হলো রাসুলুল্লাহ সাঃ এর জন্মের মাধ্যমে যে কল্যাণ আমরা পেয়েছি তা কি তার মৃত্যুর মাধ্যমে শেষ হয়ে গেছে? নিশ্চয় তা নয়। তাছাড়া রাসুলুল্লাহ সাঃ নিজেও মৃত্যুবরণের মাধ্যমে শেষ হয়ে যান নি বরং তিনি মহান রবের সান্নিধ্যে সুউচ্চ সম্মান ও সুমহান মর্যাদার অধিকারী হয়েছেন। আল্লাহর রাসূলের জন্ম বা মৃত্যু দুটোই আমাদের জন্য কল্যাণময়।

রাসুলুল্লাহ সাঃ বলেন,

আমার জীবন তোমাদের জন্য কল্যাণময়। তোমরা আমার সাথে কথা বলছো আমিও তোমাদের সাথে কথা বলছি। একইভাবে আমার মৃত্যুও তোমাদের জন্য কল্যাণময়। তোমাদের আমল আমার সামনে পেশ করা হবে যদি ভাল কিছু দেখি তবে তো আল্লাহর প্রসংশা করবো আর যদি কারাপ কিছু দেখি তবে তোমাদের জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবো। (বাযযার)

আল-হাইছামী বলেছেন হাদীসটির রাবীরা সহীহ হাদিসের রাবী।

অতএব, রাসুলের জন্ম ও মৃত্যুকে একত্রিত করে শোকে শোকিভূত হওয়ার তুলনায় আনন্দে আভিভূত হওয়াটাই যৌক্তিক।

ইমাম সুয়ূতী এ বিষয়ে আরো একটি উত্তর দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, শরীয়ত শোক-দুঃখ প্রকাশ করার ব্যাপারে উৎসাহিত করে না বরং তা গোপন করতে নির্দেশ দেয় কিন্তু আনন্দিত হলে তা প্রকাশ করার ব্যাপারে শরীয়তের নির্দেশ রয়েছে। তাই রাসুলের ওফাতে আমরা ব্যাথিত হলেও সে কারণে শোক মিছিল বের করা উতিৎ নয়। তবে তার আগমনে আনন্দ প্রকাশ করতে বাধা নেই।

মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন,

আপনার রবের নেয়ামত সম্পর্কে মানুষকে অবহিত করুন। (সুরা দোহা-১১)

গ।       কেউ কেউ বলে, জন্ম দিবস পালন করার বিষয়টি বিজাতীয় প্রথা। খৃষ্টানরা ঈসা আঃ এর জন্ম দিবস পালন করে। সম্ভবত তাদের অনুসরণেই রাসুলুল্লাহ সাঃ এর জন্ম দিন পালনের রেওয়াজ শুরু হয়েছে। অথচ রাসুলুল্লাহ সাঃ আমাদের ভিন্ন সম্প্রদায়কে অনুসরণ করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন,

যে কেউ কোনো সম্প্রদায়কে অনুসরণ করে সে তাদের মধ্যেই অন্তর্ভূক্ত। (আবু দাউদ)

অন্যান্য হাদীসের মতো এই হাদীসটিও এরা অনুধাবন করতে সক্ষম হয়নি। একটা সহজ প্রশ্নের মাধ্যমেই বিষয়টি সমাধান করা যায়। প্রশ্নটি হলো,

ভিন্ন সম্প্রদায়কে অনুসরণ করা বলতে কি বোঝায়? তারা যা করে তা করা নাকি তারা যেভাবে করে সেভাবে করা?

উদাহরণসরুপ ইয়াহুদীরা টুপি পরিধন করে আমরাও টুপি পরিধান করি কিন্তু আমরা সম্পূর্ণ মাথা ঢেকে টুপি পরিধান করি আর তারা কেবল মাথার উপরের অংশটি আবৃত করার মতো ছোট আকারের টুপি পরিধান করে। এখানে মুসলিমরা ইয়াহুদীদের সাথে সাদৃশ্য রেখেছে একথা বলার সুযেগ আছে কি?

উপরোক্ত হাদীসের ব্যাখ্যায় এটা অবশ্যই স্মরণ রাখতে হবে যে ভিন্ন সম্প্রদায়ের সাথে সাদৃশ্য রাখা বলতে বোঝায় যেসব বিষয় তাদের প্রতীক ও পরিচয় হিসেব গণ্য ঐ সকল বিষয়ে তাদের হুবহু অনুকরণ করা। কোনো একটি কাজ তারা যেভাবে করে তার চেয়ে ভিন্নভাবে করা কখনও অনুকরণ বলে গণ্য হতে পারে না।

সহীহ বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত একটি হাদীসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাঃ মদীনাতে গমণ করে দেখলেন ইয়হুদীরা আশুরার দিন সওম পালন করে। তিনি প্রশ্ন করলে তারা বলে, এই দিন মুসা আঃ ফিরআউনের হাত থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন তাই আমরা এ দিন সওম পালন করি। এটা শুনে রাসুলুল্লাহ সাঃ বলেন, আমরা তোমাদের চেয়ে মুসার বেশি আপন।

এরপর তিনি মুসলিমদের ঐ দিন সওম পালন করতে নির্দেশ দেন। পরবর্তীতে তিনি ইয়াহূদীদের সাথে অমিল রাখার জন্য আশুরার আগে বা পরে একদিন অতিরিক্ত সওম পালনের নির্দেশ দেন।

এখানে দেখা যাচ্ছে ইয়াহুদীরা যার জন্য সওম পালন করতো, যে কারণে সওম পালন করতো এবং যেদিন সওম পালন করতো এই সকল বিষয়ে মিল থাকা সত্ত্বেও কেবল সওমের সংখ্যার পার্থক্যের কারণে বিষয়টিকে অনুকরণ হিসেবে গণ্য করা হয়নি। আর রাসুলের জন্ম দিন পালন করার ব্যাপারে খৃষ্টানদের সাথে অমিল এর তুলনায় অনেক বেশি। খৃষ্টানরা ঈসা আঃ এর জন্ম দিন পালন করে আর আমরা মুহাম্মাদ সাঃ এর জন্মদিন পালন করছি, তারা যেদিন পালন করে আমরা ভিন্ন দিনে পালন করছি, তারা সূর্যের হিসাবে পালন করে আমরা করছি চন্দ্রের হিসাবে, তারা ঐ দিন মদ পান, অবৈধ প্রেম-প্রিতী, নাচা-নাচি, গান-বাজনা ইত্যাদি সর্বপ্রকারের পাপ কাজে লিপ্ত হয়ে আনন্দ প্রকাশ করে আর আমরা সীরাত মাহফিল, দোয়া-দরুদ পাঠ, যিকির-আযকার, হামদ-না’ত ইত্যাদি উত্তম কর্মের মাধ্যমে রাসুলের জন্মোৎসব পালন করি। সর্বোপরি ঈদে মিলাদুন্নবী পালন করার কারণে কেউ আমাদের ভুল করে খৃষ্টান মনে করে না বরং এর মাধ্যমে ইয়াহুদী-খৃষ্টানদের বিপরীত একটি ধর্ম তথা মুহাম্মাদ সাঃ এর অনুসারী ও ইসলাম ধর্মালম্বী একদল মানুষের অস্তিত্ব পৃথিবীবাসী নতুন করে জানতে পারে। এরপর যারা বিষয়টিকে ইয়াহুদী-খৃষ্টানদের অনুকরণ বলে নিন্দা করে তাদের বোধ-বুদ্ধি যে বেজায় নিচু পর্যায়ের তা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

ঘ।       অনেকে বলেন, ইসলামে দুটি ঈদ নির্ধারন করা হয়েছ, এর বাইরে তৃতীয় কোনো ঈদ পালন করা বিদয়াত। আমি জানি না তারা তৃতীয় কোনো ঈদ পালন করা বলতে কি বোঝায়? তারা কি অন্য যে কোনো দিনে উৎসব করা নিষিদ্ধ মনে করে নাকি অন্য কোনো দিনকে ঈদ নাম করণ করার বিরোধিতা করে?

যদি তারা বলে রাসুলের জন্ম উপলক্ষ্যে উৎসব করা তো বৈধ তবে এ দিনকে ঈদে মিলাদুন্নবী নামকরণ করা উচিৎ নয়। কারণ মুসলমানদের ঈদ দুইটি। তবে আমরা  বলবো, কোনো কিছু নিষিদ্ধ ঘোষণা করার পূর্বে কমপক্ষে শরীয়তের প্রাথমিক মূলনীতিগুলো সম্পর্কে জানতে হবে। কোনো একটি শব্দকে মুতলাকান তথা সাধারনভাবে প্রয়োগ করা আর মুক্বইয়াদান বা মুদাফান তথা কোনো কিছুর সাথে সম্পর্কিত করে প্রয়োগ করার বিধান কি কখনও এক হতে পারে! উদাহরণ স্বরুপ যে কোনো প্রকার পানি দ্বারা ওযু করা বৈধ। কিন্তু ডাবের পানি বা গোলাপ পানি ‍দিয়ে ওযু করা বৈধ নয়। কারণ এগুলো আসলে পানি নয়। তাই ডাব বা গোলাপের সাথে সম্পর্কিত করে ছাড়া সরাসরি কখনও এগুলোকে পনি বলা হয় ন।

পবিত্র কুরআনে রাসুলুল্লহ সাঃ এর উদ্দেশ্যে সলাত (দরুদ) পাঠ করতে বলা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ সাঃ ছাড়া অন্য কোনো সাহাবার উদ্দেশ্যে সরাসরি দরুদ পাঠ করা সঠিক নয় কিন্তু রাসুলের উপর দরুদ পাঠ করার সময় তার নামের সাথে তার পরিবার, সাহাবায়ে কিরাম ও সাধারন মুসলিমদের সংযুক্ত করা বৈধ। গাভীর পেটে যে বাচ্চা আছে তা জন্ম নেওয়ার পূর্বেই পেটে থাকা অবস্থায় বিক্রি করা বৈধ নয় যেহেতু তার অবস্থা সম্পর্কে আমরা কেউ জানি না। কিন্তু গাভীটি বিক্রি করার সময় তার পেটের বাচ্চাটির কারণে অধিক মূল্য গ্রহণ করা বৈধ।

যারা ঈদে মিলাদুন্নবী নাম করণের বিরোধিতা করে তারাই আবার নাফসের জিহাদ, কলমের জিহাদ ইত্যাদি শব্দ বেশি বেশি ব্যবহার করে। অথচ শরীয়তের পরিভাষায় জিহাদ বলতে কাফিরদের সাথে যুদ্ধ করাকে বোঝায়। তবে নফসের জিহাদ বা কলমের জিহাদ ইত্যাদি শব্দ প্রয়োগ করা আমরা নিষিদ্ধ মনে করি না। কেননা এটা নফস বা কলমের সাথে সম্পর্কিত করেই কেবল ব্যাবহার করা হয় সাধারন ভাবে কেবল জিহাদ শব্দটি উচ্চারণ করা হলে সদা-সর্বদা তরবারীর জিহাদই বোঝায়। এই দুটি প্রয়োগ পদ্ধতির মধ্যে ব্যপক পার্থক্য রয়েছে।

মোট কথা ঈদ শব্দটি যখন সরাসরি উল্লেখ করা হয় তখন কেবল দুই ঈদকে বোঝায়। যখন আমরা বলি, বছরে ঈদ কয়টি? একটি ছোট বাচ্চাও উত্তর দেবে দুইটি। কিন্তু যদি বলা হয় সাপ্তাহিক ঈদ কোনটি তবে উত্তর হবে জুময়ার দিন। প্রশ্ন হলো জুময়ার দিন যদি ঈদ হয় তবে তো বৎসরে ঈদ হয় ৫৪ টি । আসল কতা হলো জুময়ার দিনকে ঈদ বলা হচ্ছে বিশেষ (মুক্বয়্যাদ) অর্থে সাধারন (মুতলাক) অর্থে নয়। একইভাবে রাসুলের জন্মোৎসবকে সরাসরি কখনও ঈদ বলা হয় না। সাধারণভাবে কেউই এটা বলে না যে মুসলমানদের তিনটি ঈদ। তবে রাসুলের জন্মোৎসবের সাথে সম্পর্কিত করে ঈদ শব্দটি প্রয়োগ করা হয়। “রাসুলের জন্মের উৎসব” এই কথাটি আরবীতে প্রকাশ করার জন্য বলা হয় ঈদে মিলাদুন্নবী সাঃ। এই নামকরণে কোনা সমস্যা পরিলক্ষিত হয় না।

লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো যারা ঈদে মিলাদুন্নবী নামকরণের বিপক্ষে কথা বলে তারা কিন্তু কেবল নামকরণের বিরোধী নয় বরং রাসুলের জন্ম উপলক্ষে যে কোনো প্রকার উৎসবের আয়োজন করাকেই তারা বিদয়াত বলে। তাদের কথা হলো, আনন্দ-ফুর্তি করার জন্য ইসলামে দুটি ঈদ নির্ধারন করে দেওয়া হয়েছে। অতএব, এর বাইরে কোনো উপলক্ষে আনন্দ ফূর্তি করা যাবে না। কেবল নির্বোধ লোকেরাই এভাবে চিন্তা করতে পারে। রাসুলুল্লাহ সাঃ বলেছেন,

রোজাদার ব্যক্তিদের দুটি আনন্দের সময়। যখন যে ইফতার করে আর যখন সে আল্লাহর সাথে সাক্ষাত করবে। (বুখারী ও মুসলিম)

এর অর্থ কি এই যে, রোজাদার ব্যক্তি অন্য কোনো সময় আনন্দিত হতে পারবে না? যদি কেউ সাহরী খাওয়র সময় আনন্দিত হয় তবে কি তার পাপ হবে?

এখন যদি কেউ বলে দুই ঈদ যেভাবে পালন করা হয় সেভাবে অন্য কোনো দিবস পালন করা যাবে না, যাতে মানুষ এই তৃতীয় উৎসবটিকেও দুই ঈদের মতো মনে না করে। তবে আমরা বলব, এই কথাটি আমরাও স্বীকার করি। কোনো বিষয়ে মানুষের সঠিক আক্বীদা বিকৃত হতে পারে এমন পন্থা-পদ্ধতি অবলম্বন না করাই উচিৎ যেমনটি আমরা পূর্বেও বলেছি। কিন্তু ঈদে মিলাদুন্নবী কি দুই ঈদের মতো পালন করা হয়? দুই ঈদে মানুষ যেভাবে নতুন পোশাক ক্রয় করে, নানা রকম মজাদার খাবার রান্না করে, আত্নীয় স্বজনকে দাওয়াত করে, রাসুলের জন্মদিবসে কি তা করা হয়? সর্বোপরি দুই ঈদে সকালে যে অতিরিক্ত তাকবীর সহ বিশেষ সলাত আদায় করা হয় সেটা কি রাসুলের জন্মোৎসবে করা হয়? এধরণের সুস্পষ্ট পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও কি এমন বলা যায় যে, একসময় ঈদে মিলাদুন্নবী কে মানুষ দুই ঈদের মতো সমপর্যায়ের বিধান বলে মনে করবে! আমরা অন্তত এমনটি মনে করি না। যারা এভাবে চিন্তা করেন তারা নিজেরা ঈদে মিলাদুন্নবী পালন না করলে না করুন। এটা তাদের ব্যক্তিগত অধিকার। কিন্তু যারা ভিন্নভাবে চিন্তা করে তাদেরর তিরস্কার করার অধিকার তাদের নেই।

ঙ। কেউ কেউ বলে, রাসুলের জন্ম দিন পালন করতে হলে লক্ষ লক্ষ সাহাবায়ে কিরামের জন্ম দিন পালন করতে হবে, পূর্ববর্তী নবী-রাসুলদের জন্ম দিন পালন করতে হবে ইত্যাদি। সম্ভবত এরাই সর্বাধিক নির্বোধ। কোনো একটি আয়াত তেলোয়াত করলে কি পবিত্র কুরআনের সবগুলো আয়াত ইত্যাদি উচ্চারণ করা বাধ্যতামূলক হবে? একটি ভাল কাজ করলে কি দুনিয়ায় যত ভাল কাজ আছে সব গুলো আদায় করতে হবে? রাসুলুল্লাহ সাঃ ফিরআউনের হাত থেকে মুসা আঃ এর মুক্তি পাওয়া উপলক্ষে সওম পালন করলেন। এর পূর্বে তো আল্লাহ বহু সংখ্যক নবী-রাসুল ও নেককার ব্যক্তিকে কাফিরদের হাত থেকে মুক্তি দিয়েছেন তিনি তাদের সবার জন্য সওম পালন করেন নি কেনো? আরবীতে একটি প্রবাদ আছে

কোনো কিছুর সবটুকু গ্রহণ করতে না পারলেই তার সবটুকু বর্জন করতে হবে এমন নয়। অর্থাৎ কল্যানময় কাজ যতটুকু সম্ভব করে যেতে হবে। সবটুকু করতে পারবো না বলে হতাশ হয়ে সম্পূর্ণ বর্জন করা বুদ্ধিমানের কাজ নয় বরং যেটুকু পারবো সেটুকু আদায় করতে হবে।

আমরা সমস্ত নবী রাসুল ও নেককার ব্যক্তিদের জন্মোৎসব পালন করতে পারছি না এটা সঠিক কিন্তু যিনি তাদের নেতা আল্লাহর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি তার জন্মোৎসব পালন করছি এটাই কি যথেষ্ঠ নয়!

এই হলো, রাসুলুল্লাহ সাঃ এর জন্মোৎসব সম্পর্কে উত্থাপিত কিছু সংশয়। আমরা যার সদুত্তর প্রদান করার চেষ্টা করেছি আর আল্লাহই তৌফিকদাতা। এই আলোচনায় যারা মনোযোগ নিবন্ধ করেছেন তারা অনুধাবন করতে সক্ষম হবেন যে ঈদে মিলাদুন্নবী উদযাপনের বিপক্ষে যেসব যুক্তি-প্রমান পেশ করা হয় সেগুলো দূর্বল। একারণে বরেণ্য ওলামায়ে কিরামের একটি বিরাট অংশ ঈদে মিলাদুন্নবী উদযাপনের পক্ষে রায় দিয়েছেন।

এদের মধ্যে রয়েছেন, ইমাম নাব্বীর শায়েখ আবু শামা আল-মাকদিসী, তিনি বিদয়াতের নিন্দা করে একটি বই লিখেছেন। বইটির নাম “আলবায়িস আলা ইনকারিল বিদায়ি ওয়াল হাওয়াদিস”

সেখানে তিনি বলেন,

আমাদের সময় যেসব উত্তম বিদয়াত (নতুন সৃষ্ট বিষয়) চালু হয়েছে তা হলো ঐ জিনিস যা ইরবিল নামক শহরে প্রথম শুরু হয়েছে। এটা হলো প্রতি বছর রাসুলের জন্মদিনে দান-সদকা, উত্তম কাজ, সাজ-সজ্জা এবং আনন্দ উৎসবের আয়োজন করা। এতে এক দিকে যেমন দরিদ্রের প্রতি উত্তম আচরণ করা হচ্ছে বিপরীত দিকে যে এটা করছে তার অন্তরে যে রাসুলুল্লাহ সাঃ এর প্রতি অথ্যাধিক ভালবাসা ও সম্মান রয়েছে তা প্রমাণিত হচ্ছে। তাছাড়া আল্লাহ যে সমগ্র জগৎবাসীর জন্য রহমত হিসেবে তার রাসুলকে এই দিন দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন সে ব্যাপারে শুকরিয়া আদায় করা হচ্ছে।

মালেকী মাজহাবের প্রখ্যাত ফক্বীহ্ ইবনুল হাজি আল-মাদখাল নামক কিতাবে রবিউল আওয়াল মাসে রাসুলের জন্ম উপলক্ষে অতিরিক্ত ইবাদত-বান্দেগী করার ব্যাপারে উৎসাহিত করেছেন।

তবে মালেকী মাজহাবের অন্য এক ফক্বীহ্ আল-ফাকিহানী এ বিষয়টিকে বিদয়াত হিসেবে আখ্যায়িত করে নিন্দা করেছেন। ইমাম সূয়ূতী তার মতামত খন্ডায়ন করে একটি রেসালা প্রণয়ন করেছেন। তিনি এর নাম দিয়েছেন, “আল-মাকসিদ ফি আমালিল মাওলিদ” উপরে আমরা এ সম্পর্কে ইমাম সুয়ূতী থেকে যেসব মতামত উল্লেখ করেছি তা এই রেসালার অন্তর্গত। এই রেসালাতে ইমাম সুয়ূতী উল্লেখ করেন, হাফেজ ইবনে হাযার আল-আসক্বালানীও এই মতের পক্ষাবলম্বন করেছেন। তিনি বলেছেন,

রাসুলুল্লাহ সাঃ এর জন্মোৎসব পালন করা বিদয়াত। তিনটি সোনালী যুগের কেউ এটা করেছেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায় নি। তবে রাসুলুল্লাহ সাঃ এর জন্ম উপলক্ষে এখন যা কিছু করা হয় তার মধ্যে কিছু উত্তম বিষয় রয়েছে আর কিছু নিন্দনীয় বিষয় রয়েছে। যদি কেউ এ উপলক্ষে কেবল উত্তম কাজ করে আর নিন্দনীয় কাজ থেকে দূরে থাকে তবে এটা উত্তম বিদয়াত হিসেবে গণ্য হবে। এর অণ্যথা হলে নিন্দনীয় হবে।

ইরবিলের বাদশা প্রথম এই প্রথা চালু করেন। তার সম্পর্কে আলোচনা করতে যেয়ে ইবনে কাছির রঃ বলেন,

তিনি রবিউল আওয়াল মাসে মাওলিদ শরীফ (পবিত্র ঈদে মীলাদুন্নবী পালন করতেন। এ উপলক্ষে তিনি ব্যাপক উৎসবের আয়োজন করতেন। তিনি ছিলেন বীর, বুদ্ধিমান, এবং ন্যায়পরায়ন। রহেমাহুল্লাহ তায়ালা। (আল-বিদাইয়া ওয়ান নিহাইয়া)

মোট কথা বহু সংখ্যক ওলামায়ে কিরাম ঈদে মীলাদুন্নবী পালন করা বৈধ এবং উত্তম হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। বিপরীত দিকে কেউ কেউ এটাকে বিদয়াত হিসেবে আখ্যায়িত করে নিন্দা করেছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন মালেকী মাজহাবের আল-ফাকিহানী যেমনটি আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি। মালেকী মাজহাবের অন্য এক ফক্বীহ ইবনুল হাজী থেকে বিষয়টি অপছন্দ করার পক্ষে একটি বর্ণনা পাওয়া যায়। তবে সেটা ব্যাখ্যাস্বাপেক্ষ। যেহেতু তিনি নিজেই রবিউল আওয়াল মাসে বেশি বেশি আমল করার এবং রাসুলের জন্ম উপলক্ষে আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করার ব্যাপারে উৎসাহিত করেছেন। ইমাম ইবনে তাইমিয়াও বিষয়টিকে অপছন্দ করেছেন। তবে তিনি এটা স্বীকার করেছেন যে যারা এটা করে যদি তারা নিষিদ্ধ কর্মকান্ড থেকে দূরে থাকে তবে তাদের প্রচুর পরিমাণ সওয়াব হয়। তিনি বলেন,

রাসুলুল্লাহ সাঃ এর জন্ম দিবস পালন করা এবং এটাকে নিয়মিত উৎসবের দিন হিসেবে গ্রহণ করা যা কিছু লোক করে থাকে অনেক সময় এটা যারা করে তাদের প্রচুর সওয়াব হয়। তাদের সুন্দর নিয়তের কারণে এবং রাসুলুল্লাহ সাঃ এর প্রতি ভালবাসা প্রকাশ করার কারণে। (ইক্তিদায়ে সিরাত)

ইমাম ইবনে তাইমিয়ার এই কথাটির সঠিক অর্থ অনেকের নিকট স্পষ্ট নয়। ঈদে মীলাদুন্নবী কে বিদয়াত বলা সত্ত্বেও এটা যারা পালন করে তাদের সওয়াব হবে এমন মন্তব্য তিনি কিভাবে করতে পারেন! যারা বিদয়াত বলতে সর্বাবস্থায় হারাম তথা পাপের কাজ বোঝেন তাদের নিকট বিষয়টি বোধগম্য না হওয়াই স্বাভাবিক। এর বিপরীতে আমরা উপরে যা বর্ণনা করেছি সে আলোকে চিন্তা করলে বিষয়টি সহজে সমাধান করা সম্ভব। আমরা বলেছি ওলামায়ে কিরাম বিদয়াত বলতে সর্বাবস্থায় হারাম বা পাপের কাজ বোঝেন না বরং অনেক সময় তারা বিদয়াত বলতে মাকরুহ তথা অপছন্দনীয় কাজ বুঝিয়ে থাকেন যাতে লিপ্ত হলে পাপ হয় না। অনেক সময় এমন কাজকেও বিদয়াত হিসেবে আখ্যায়িত করা হয় যা আসলে বৈধ বা উত্তম কিন্তু তাতে লিপ্ত হলে মানুষের আক্বীদা-বিশ্বাস পরিবর্তীত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। একারণে গভীর দূরদৃষ্টি সম্পন্ন ওলামায়ে কিরাম তা থেকে নিষেধ করে থাকেন। কিন্তু যারা ততটা জ্ঞান গরিমার অধিকারী না হওয়ার কারণে বিষয়টির ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে অবগত নয় তারা ঐ সকল কাজে লিপ্ত হয়। এমতাবস্থায় যেহেতু মূল কাজটি উত্তম কাজ আর এর সাথে যে ক্ষতিকর প্রভাব জড়িয়ে আছে তা স্পষ্ট নয় একারণে ঐ সকল ব্যক্তিদের সওয়াব হয়। এমনও হতে পারে যে একদল আলেম কোনো একটি কাজে লিপ্ত হলে কিছু সমস্যা হতে পারে এমন মনে করার কারণে উক্ত কাজ হতে মানুষকে নিষেধ করছেন কিন্তু অন্য কিছু আলেম সমস্যা মনে করছেন না তাই তাতে লিপ্ত হওয়ার অনুমতি প্রদান করছেন। এক্ষেত্রে প্রতিটি দলকে তাদের নিজ নিজ গবেষণা ও বুঝ অনুযায়ী প্রতিদান প্রদান করা হবে। এখানে এক দল আরেক দলকে তিরস্কার করা অনুচিত। এভাবে চিন্তা করলে ইমাম ইবনে তাইমিয়ার উপরোক্ত বক্তব্যে কোনো জটিলতা পরিলক্ষিত হয় না। তবে এর মাধ্যমে এটা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, ঈদে মীলাদুন্নাবী এবং এই জাতীয় অন্যান্য বিষয়াবলীকে যারা সুস্পষ্ট হারাম বা পাপের কাজ মনে করে ফলে এসব ব্যাপারে আজীবন সংগ্রামে লিপ্ত হওয়ার প্রতিজ্ঞা করে, এসব কারণে মুসলিমদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে তারা সকল ওলামায়ে কিরামের মতামতের বিপরীত মতের উপর রয়েছে। এসব বিষয়ে আলেমদের দুটি মত রয়েছে। কেউ কেউ এগুলোকে বৈধ ও উত্তম বলেছেন অন্যরা বলেছেন মাকরুহ। এসব বিষয়কে হারাম ও পাপের কাজ হিসেবে আখ্যায়িত করার মতটি কোনো ক্রমেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাছাড়া মতপার্থক্যপূর্ণ বিষয়ে একদল অন্য দলকে পথভ্রষ্ট ও বিদয়াতী আখ্যা দেওয়াই সমীচীন নয়। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক পথ প্রদর্শন করুন।

ঈদে মিলাদুন্নবী এর বিধান – শায়েখ আব্দুল্লাহ আল-মূনীর এর প্রবন্ধটি পড়া শেষ হলে আপনার বন্ধুদের মাঝে শেয়ার করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.