গনক ও জ্যোতিষীর বিধান- শায়েখ আব্দুল্লাহ আল-মূনীর

গনক ও জ্যোতিষীর বিধান – শায়েখ আব্দুল্লাহ আল-মূনীর এর প্রবন্ধটি পড়া শেষ হলে শেয়ার করতে ভুলবেন না।

রসুলুল্লাহ সাঃ বলেন, যে কেউ ভাগ্য গননাকারী বা ভবিষ্যৎ বক্তার নিকট আগমন করে এবং তার কথা সত্য বলে বিশ্বাস করে তবে সে মুহাম্মাদ সাঃ এর উপর যা অবতীর্ণ হয়েছে তার সাথে কুফরী করলো। (মুসনাদে আহমাদ, মুস্তাদরাকে হাকিম, আজ-জাহাবী বলেন, হাদীসটি বুখারী মুসলিমের শর্তে সহীহ।

আবু দাউদ ও ইবনে মাযাতে অনুরুপ বর্ণনা এসেছে, তবে সেখানে অতিরিক্ত বলা হয়েছে, “অথবা হায়েজ গ্রস্থ মহিলার সহিত মিলিত হয় বা তার স্ত্রীর পশ্চাতে মিলিত হয় তবে সে কাফির হয়ে যায়। আবু দাউদের রেওয়ায়েতে বলা হয়েছে, মুহাম্মদ সাঃ যা নিয়ে এসেছেন সে তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

সহীহ্ মুসলিমে এসেছে,

যে কেউ ভবিষ্যৎবক্তার নিকট আগমন করে এবং তার নিকট কিছু প্রশ্ন করে তবে চল্লিশ দিনের সলাত কবুল হয় না।

তিবরানী বর্ণিত একটি রেওয়ায়েতে অতিরিক্ত বলা হয়েছে,

যে কেউ গনকের নিকট গমণ করে এবং তার কথা সত্য বলে বিশ্বাস করে তবে সে মুহাম্মাদ সাঃ যে দ্বীন নিয়ে এসেছেন তা থেকে বের হয়ে যায় আর যে গনকের নিকট গমণ করে কিন্তু তাকে বিশ্বাস করে না তার চল্লিশ দিনের সলাত কবুল হয় না। (মু’জামুল আওসাত)

অন্য হাদীসে এসেছে, রসুল্লাহ সাঃ কুকুর বিক্রয় করে মূল্য গ্রহণ করা, ব্যাভিচারের মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ এবং ভাগ্য গননার পারিশ্রমিক থেকে নিষেধ করেছেন। (বুখারী ও মুসলিম)

ইবনে বাত্তাল রঃ বুখারী শরীফের ব্যাখ্যায় বলেন, “রসুল্লাহ্ সাঃ গনকের পারিশ্রমিক নিষিদ্ধ সাব্যস্ত করেছেন। এটা হারাম হওয়ার ব্যাপারে উম্মতের ইজমা সম্মাদিত হয়েছে।” ইমাম নাব্বী রঃ মুসলিম শরীফের ব্যাখ্যায় বলেন, ভাগ্য গননার পারিশ্রমিক হারাম হওয়ার ব্যাপারে মুসলিমদের ইজমা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।”

ইমাম নাব্বী রঃ ইমাম আল-খাত্তাবী থেকে উল্লেখ করেন,

আরবে কিছু লোক ছিল যারা দাবী করতো আমরা অনেক গায়েবী বিষয় জানি। তাদের মধ্যে কেউ কেউ বলতো আমার নিকট জিন আছে যে বিভিন্ন বিষয়ে আমাকে অবহিত করে থাকে। কেউ কেউ বলতো আমি বিভিন্ন বিষয়ের উপর চিন্তাগবেষণা করে এসব বিষয়ে জানতে পারি। এদের কাউকে কাউকে বলা হতো আররাফ এর কোনো বিষয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ের উপর চিন্তা করে উক্ত বিষয়টি সম্পর্কে মন্তব্য করতো। যেমন, কোনো কিছু চুরি হওয়ার পর কে চুরি করেছে তা বলে দেওয়া, কোনো মহিলার সাথে কার অবৈধ সম্পর্ক আছে তা বলে দেওয়া ইত্যাদি। কেউ কেউ জ্যোতিষীকে (যে তারকারাজির মাধ্যমে ভবিষ্যৎ বলে দেওয়ার দাবী করে) গনক হিসেবে আখ্যায়িত করতো। হাদীসে এই সকল লোকদের নিকট গমন করা এবং তারা যা কিছু বলে তা সত্যায়ন করা হতে নিষেধ করা হয়েছে। (শারহে মুসলিম)

এই সকল হাদীসে কারো ভাগ্য ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে মন্তব্য করা বা নিজের ভাগ্য জানার জন্য কারো নিকট গমন করার ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা বর্ণনা করা হয়েছে। এরুপ কঠেরতার কারণে কেউ কেউ যে কোনো প্রকারে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে মন্তব্য করা ও ভাগ্য গননাকে কুফরী হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। যারা এগুলো করে এবং যারা তাদের নিকট গমণ করে ও তাদের কথা বিশ্বাস করে বা তাদের কথা অনুযায়ী আমল করে তাদের সকলকে কাফির হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

এই ভুল ধারনার বিপরীতে আমরা বলব, ভাগ্য গননা ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে মন্তব্য করার বিষয়টি বিভিন্নরকম হতে পারে। বিষয়টি যেহেতু গায়েবের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত তাই উপরে আমরা গায়েবী জ্ঞান সম্পর্কে যে বিস্তারিত বর্ণনা উল্লেখ করেছি সে আলোকে এর সমাধান করতে হবে। আমরা বলেছি, গায়েবী জ্ঞানের দাবী করা তিনটি অবস্থায় কুফরী হবে।

            (ক)      আল্লাহর পক্ষ থেকে ছাড়াই কোনো বস্তু বা ব্যক্তির মাধ্যমে সরাসরি কোনো বিষয়ে জানার দাবী করা।

            (খ)       রাসুল ছাড়া অন্য কারো জ্ঞানকে নিশ্চিত ও অকাট্য সত্য হিসেবে বিশ্বাস করা।

            (গ)       নবী-রাসুল, ফেরেস্তা, মানুষ জিন ইত্যাদি যে কাউকে গায়েবের সকল বিষয়ে সামগ্রিকবাবে জ্ঞান দেওয়া হয়েছে এমন মনে করা।

যদি কেউ এই তিনটি বিষয়ের কোনো একটি দাবী করে সে কাফির হবে। আর যদি কেউ জিনের মাধ্যমে বা কাশফ-ইলহামের মাধ্যমে গায়েব জানার দাবী করে তবে তা কুফরী হবে না।

আল-মানাবী রঃ বলেন,

যে ব্যক্তি গনককে সত্যবাদী মনে করে যদি সে এমন আক্বীদা রাখে যে, সে নিজেই গায়েব সম্পর্কে অবগত তবে সে কাফির হবে আর যদি সে মনে করে জিনের ফেরেস্তাদের নিকট হতে যে খবর শোনে তা তদের নিকট পৌছে দেয় অথবা এই ব্যক্তিকে ইলহামের মাধ্যমে কিছু খবর জানানো হয় আর একারণে তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করে তবে এটা কুফরী হবে না। (ফায়দুল কাদীর)

যে হাদীসে গনকের কথায় বিশ্বাস স্থাপণ করা কুফরী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে, ইমাম তিরমিযী সে হাদীসটি উল্লেখ পূর্বক বলেন,

আলেমদের নিকট হাদিসটি (প্রকৃত অর্থে কুফরী নয় বরং) তাগলীজ (অধিক কঠোরতা প্রদর্শন) অর্থে এসেছে। (জামে তিরমিযী)

হাদীসটি যে প্রকৃত অর্থে কুফরী বোঝায় নি তার প্রমান হলো, গনকের নিকট গমন করার সাথে সাথে হায়েজগ্রস্ত মহিলামর সাথে মিলিত হওয়া এবং স্বীয় স্ত্রীর পশ্চাতে সঙ্গম করার বিষয়টিকেও কুফরী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। অথচ এটা নিশ্চিত যে এ বিষয়গুলো প্রকৃতঅর্থে কুফরী নয়। আর যদি ধরেও নেওয়া হয় যে, প্রকৃত অর্থে কুফরী বোঝানো হয়েছে, তবু কথা হলো, এখানে গনকের কথাকে অকাট্য সত্য হিসেবে গ্রহণ করাকে কুফরী বলা হয়েছে। কারো কথাকে সত্যায়ন করা অর্থ সেটাকে নিশ্চিত সত্য বলে মনে করা। আমরা বলেছি, নবী-রাসুল ছাড়া অন্য কেউ গায়েবের কোনো ব্যাপারে নিশ্চিতভাবে জানতে পারে এমন মনে করা কুফরী। যেসব জিনেরা ফেরেশতাদের কথা শুনে গনকদের নিকট পৌছে দেয় তারাও একটি সত্যের সাথে একশটি মিথ্যা মিশ্রিত করে গনকদের তা শুনিয়ে থাকে এবং তারপর গনকরাও তার সাথে আরো কিছু মিথ্যা মিশ্রিত করে মানুষের নিকট তা বর্ণনা করে। ফলে এর মাধ্যমে নিশ্চিত কোনো সত্যে উপনিত হওয়া সম্ভব হয় না। অতএব যে কেউ গনকের কথাকে নিশ্চিত ও অকাট্য সত্য মনে করে সে কাফির হবে। কিন্তু যে ব্যক্তি গনকের নিকট গমন করে এবং তার কথা সত্য হতে পারে এমন মনে করে সেটা মেনে চলে সে কাফির হবে না। তবে তার এ কাজ হারাম হবে কারণ রসুলুল্লাহ গনকদের নিকট গমন করতে নিষেধ করেছেন। এমনকি তাদের কথা বিশ্বাস না করলেও কেবল কৌতুহলবশত প্রশ্ন করা হলেও চল্লিশ দিনের সলাত কবুল না হওয়ার কথা বলা হয়েছে। গনকদের সম্পর্কে রসুলুল্লাহ সাঃ কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “তারা কিছু নয়” (বুখারী ও মুসলিম)

অর্থাৎ তাদের কথার কোনো ভিত্তি নেই। আর এই প্রকার ভিত্তিহীন বিষয়ের পিছনে ছুটাছুটি করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “যে বিষয়ে তোমরা জ্ঞান নেই তার পিছনে ছুটো না” (বানী ইসরাইল-৩৬)

গনক ও জ্যোতিষীর বিধান- শায়েখ আব্দুল্লাহ আল-মূনীর এর প্রবন্ধটি পড়া শেষ হলে আপনার বন্ধুদের মাঝে শেয়ার করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *